সীমানা ছাড়িয়ে শিল্পের সেতুবন্ধ: ঢাকার বুকে ভারত-বাংলাদেশের ‘সম্প্রীতি’

 প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১০:২৯ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

সীমানা ছাড়িয়ে শিল্পের সেতুবন্ধ: ঢাকার বুকে ভারত-বাংলাদেশের ‘সম্প্রীতি’

​নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

​রাজধানীর গুলশানের ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের (আইজিসিসি) মিলনায়তনে যখন প্রদীপগুলো জ্বলে উঠল, তখন মনে হচ্ছিল প্রতিটি শিখা যেন ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন হৃদস্পন্দনের কথা বলছে। উপলক্ষ ছিল ‘সম্প্রীতি’ শীর্ষক এক অনন্য শিল্প প্রদর্শনীর উদ্বোধন। বুধবার সন্ধ্যায় জাঁকজমকপূর্ণ এই আয়োজনে উঠে এল দুই দেশের বন্ধুত্ব, শিল্প এবং আত্মার গভীর সংযোগের গল্প।

​রবির আলোয় উদ্বোধনী ক্ষণ

​অনুষ্ঠানের শুরুটা ছিল কিছুটা আবেগের এবং শ্রদ্ধার। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী স্মরণে প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে প্রদর্শনীর শুভ সূচনা করা হয়। রবীন্দ্রনাথ যে দুই দেশের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেই সত্যই যেন বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল মিলনায়তন জুড়ে। প্রদীপ শিখার কম্পনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ নাসরিন ইলার কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীতের সুর ভেসে এল, তখন উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে তৈরি হলো এক মায়াবী আবহ।

​অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। বরেণ্য শিল্পী রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, অধ্যাপক ফরিদা জামান এবং অধ্যাপক আবদুস সাত্তারও তাঁদের উপস্থিতি দিয়ে অনুষ্ঠানকে মহিমান্বিত করেন।

​শিল্প যখন কূটনৈতিক ভাষা

​ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা তাঁর বক্তব্যে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন:

​"রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক আলোকবর্তিকা। তিনি এমন এক মানবতাবাদ ও সৃজনশীলতার প্রতীক, যা যুগের পর যুগ আমাদের দুই দেশের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি ইতিহাস, ভাষা এবং মানুষের হৃদয়ের বন্ধন।"

​তিনি আরও যোগ করেন, শিল্পকলা এমন এক শক্তিশালী মাধ্যম যা সব সীমান্ত ছাড়িয়ে মানুষের মধ্যে সংলাপ ও সহমর্মিতার পথ প্রশস্ত করে। সাম্প্রতিককালে প্রয়াত প্রথিতযশা শিল্পী ও বৃত্তিপ্রাপ্ত শিল্পী তরুণ ঘোষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি বলেন, তাঁর অনুপস্থিতি এই অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতা। তরুণ ঘোষের স্মরণে তাঁর একটি বিশেষ শিল্পকর্মও প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে।

​তেত্রিশ শিল্পীর ক্যানভাসে ‘সম্প্রীতি’

​ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনসের (আইসিসিআর) ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত ১০ ও ১১ এপ্রিল আয়োজিত হয়েছিল একটি বিশেষ ‘শিল্প শিবির’। সেই শিবিরের নিরলস সৃজনশীলতার ফসলই হলো এই ‘সম্প্রীতি’ প্রদর্শনী।

​প্রদর্শনীতে ৩৩ জন সমসাময়িক বাংলাদেশি এবং বৃত্তিপ্রাপ্ত শিল্পীর কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে। বরেণ্য শিল্পী আবদুস শাকূর, আবদুস সাত্তার, রঞ্জিত দাস, জামাল আহমেদ ও নাইমা হকের তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠেছে জীবনের গল্প, প্রকৃতির রূপ এবং দুই ভূখণ্ডের নাড়ির টান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক সঞ্জয় চক্রবর্তীর সুনিপুণ কিউরেশনে প্রতিটি চিত্রকর্ম যেন দর্শককে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।

​সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নতুন দিগন্ত

​শিল্পী রফিকুন নবী ও মনিরুল ইসলাম আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই ধরনের প্রদর্শনী ভবিষ্যতে দুই দেশের শিল্পীদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ বাড়াবে। এটি কেবল একটি প্রদর্শনী নয়, বরং শিল্পীদের আত্মার মেলবন্ধন, যা দুই দেশের সাংস্কৃতিক সংযোগকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।

​প্রদর্শনীর সময়সূচি:

গুলশানের ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে এই চমৎকার আয়োজনটি চলবে আগামী ১৭ মে পর্যন্ত। প্রতিদিন দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এই গ্যালারি, যেখানে শিল্পের আলোয় খুঁজে পাওয়া যাবে ভারত ও বাংলাদেশের চিরন্তন বন্ধুত্বের প্রতিচ্ছবি।

Advertisement
Advertisement
Advertisement