রান্নাঘরে আগুন: আশি টাকার নিচে মিলছে না সবজি, মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর বাজারগুলোতে আজ যেন এক অদৃশ্য আগুনের উত্তাপ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনের সকালে থলে হাতে বাজারে গিয়ে মধ্যবিত্তের কপালে কেবলই চিন্তার ভাঁজ। যে কাঁচা বাজারের রঙ দেখে একসময় মন জুড়িয়ে যেত, আজ সেই পটল-ঝিনুক-বেগুনের দাম শুনলে সাধারণ ক্রেতার রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির অজুহাত আর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে সবজির দাম এখন আকাশচুম্বী; আশি টাকার নিচে কোনো সবজি কেনাই যেন এখন বিলাসিতা।
সকালবেলার শান্ত রামপুরা বাজারে বেসরকারি চাকরিজীবী সাইদুর রহমানের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বিষণ্ণ মনে ব্যাগের দিকে তাকিয়ে তিনি বলছিলেন, "আগে বাজারে এসে ভাবতাম কী রেখে কী কিনব, আর এখন ভাবছি কী না কিনলে চলবে।" সত্যি বলতে, বাজারে আজ ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে হাত দেওয়ার মতো সবজি খুব কমই আছে। লম্বা বেগুনের কেজি ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে, আর গোল বেগুন তো ১২০ টাকার ঘরে রাজত্ব করছে। এমনকি যে পেঁপেকে একসময় সবজির মধ্যে সবচেয়ে 'সস্তা' ও 'গরিবের বন্ধু' ভাবা হতো, সেই পেঁপেও আজ ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। শসা আর কাঁকরোলের দাম যেন প্রতিযোগিতায় মেতেছে, প্রতি কেজি কিনতে গুনতে হচ্ছে ১২০ টাকা।
বাজারের এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির নেপথ্যে বিক্রেতারা শোনালেন তাদের চিরাচরিত অভাবের গল্প। মালিবাগের সবজি বিক্রেতা চাঁদ মিয়া ঝুড়িতে থাকা অল্প কিছু পটল গুছিয়ে রাখতে রাখতে বলেন, "আমাদের কি আর ব্যবসা করার সাধ নেই বাবা? ট্রাক ভাড়া বেড়েছে, তার ওপর টানা বৃষ্টিতে ক্ষেতের সবজি পচে যাচ্ছে। আড়তে মাল নেই, তাই বেশি দামে আনতে হচ্ছে।" তিনি আরও যোগ করেন, আগে যারা এক কেজি করলা নিতেন, দামের চোটে এখন তারা আধা কেজিতেই সন্তুষ্ট থাকছেন। ফলে খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফাও আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
বাজারের অলিগলি ঘুরে দেখা যায়, কাঁচা মরিচের ঝাল আজ শুধু স্বাদেই নয়, দামেও। ১৬০ টাকা কেজির নিচে মরিচ মেলা ভার। সাধারণ মানুষের পাত থেকে ধীরে ধীরে পুষ্টিকর সবজিগুলো হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সাধারণ ক্রেতাদের দাবি, পরিবহন ও মৌসুমের দোহাই দিয়ে প্রতি বছরই এমন কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, যার বলি হতে হয় খেটে খাওয়া মানুষকে।
তবে আশার কথা এটুকুই যে, নতুন মৌসুমের সবজি পুরোপুরি বাজারে এলে এবং আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকলে দামের এই ঊর্ধ্বগতি হয়তো কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে এই অস্থিরতা কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তার কোনো সদুত্তর নেই কারো কাছে। দিনশেষে বাজারের থলি অর্ধেক খালি রেখেই ঘরে ফিরছেন হাজারো মানুষ, যাদের মনে কেবল একটাই প্রশ্ন— সবজির দাম যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদটুকুও কি নাগালের বাইরে চলে যাবে?