বরাদ্দ আছে, বাস নেই: ঢাবি ট্রেজারারের দপ্তরে ডাকসুর ‘রুদ্ধশ্বাস’ অবস্থান

 প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১২:০৪ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

বরাদ্দ আছে, বাস নেই: ঢাবি ট্রেজারারের দপ্তরে ডাকসুর ‘রুদ্ধশ্বাস’ অবস্থান

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

​ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত চত্বর থেকে শুরু করে নীলক্ষেত মোড়—শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের এক আক্ষেপের নাম ছিল শনিবারের বাস ট্রিপ। সেই আক্ষেপ মেটাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) যখন ইউজিসি থেকে সাড়ে চার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে এলো, তখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে স্বস্তির হাওয়া বয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি এখন রূপ নিয়েছে বিক্ষোভে। অভিযোগ উঠেছে, খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার (কোষাধ্যক্ষ) এই উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের পথে ‘কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

​বৃহস্পতিবার (৭ মে) গোধূলি যখন নামছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের পরিবেশ তখন থমথমে। ভেতরে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের সভা। আর বাইরে তখন স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছে চত্বর। “বাজেট নিয়ে টালবাহানা, চলবে না চলবে না”—এমন সব তীক্ষ্ণ স্লোগান নিয়ে সিনেট ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন ডাকসুর একদল নেতা। তাদের নিশানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার।

​ঘটনার সূত্রপাত পরিবহন খাতের সেই বিশাল বরাদ্দ নিয়ে। ডাকসু নেতাদের দাবি, তারা অনেক দেনদরবার করে ইউজিসি থেকে সাড়ে চার কোটি টাকা ছাড় করিয়ে এনেছেন যাতে শনিবারও শিক্ষার্থীদের জন্য বাস চলাচল নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু ট্রেজারারের দপ্তরে গিয়ে সেই ফাইল যেন ‘বন্দি’ হয়ে আছে। ডাকসুর ছাত্র পরিবহন বিষয়ক সম্পাদক আসিফ আবদুল্লাহর কণ্ঠে ঝরছিল একরাশ ক্ষোভ ও হতাশা। তিনি জানালেন, ফাইলটি ট্রেজারারের টেবিলে দিনের পর দিন পড়ে থাকলেও তিনি তা ছাড় করছেন না। আসিফের বয়ানে, "আমরা যখন স্যারের কাছে জবাব চাইতে গেলাম, তিনি বেশ রুক্ষ স্বরেই আমাদের জানিয়ে দিলেন যে তার অফিসের সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নেবেন এবং কখন ফাইল ছাড়বেন তা একান্তই তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা।"

​এই বিরোধ কেবল বাসের ট্রিপেই সীমাবদ্ধ নেই। ডাকসু নেতাদের অভিযোগের আঙুল আরও গভীরে। কেন্দ্রীয় মসজিদে এসির ব্যবস্থা করা হলেও সেটির বিদ্যুৎ সংযোগ মিলছে না, আবার কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংস্কারের কোটি টাকার প্রকল্পও নাকি আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে আটকে আছে। আসিফ আবদুল্লাহ প্রশ্ন তোলেন, "আমরা দুই বছরের বাজেট নিয়ে এসেছি। ট্রেজারার স্যার প্রশ্ন তুলছেন দুই বছর পর কী হবে? আমাদের মেয়াদ এক বছর হতে পারে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রস্বার্থ তো চিরস্থায়ী। তিনি নিজে দুই বছর পর এই চেয়ারে থাকবেন কি না, তার কি কোনো গ্যারান্টি আছে?"

​আন্দোলনকারী নেতাদের মতে, ডাকসুর সাফল্যকে ম্লান করে দিতে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে সংগঠনটিকে অকার্যকর প্রমাণ করতেই ট্রেজারার প্রতিটি উন্নয়নমূলক কাজে বাধা সৃষ্টি করছেন। সিন্ডিকেট সভা চলাকালীন এই অবস্থান কর্মসূচি কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এটি ছিল ক্ষোভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের পাওনা এবং অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না।

​রাতের অন্ধকারে যখন মশাল আর প্ল্যাকার্ড হাতে ডাকসু নেতারা অবস্থান করছিলেন, তখন ভেতরে চলা সিন্ডিকেট সভার দিকেই ছিল সবার নজর। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহমেদ কিছুটা আশার বাণী শোনান। তিনি জানান, সিন্ডিকেট সভায় এই অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং সেখান থেকেই হয়তো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

​ক্যাম্পাস জুড়ে এখন একটাই আলোচনা—প্রশাসনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কি তবে শিক্ষার্থীদের নাগরিক সুবিধাকেই গিলে খাবে? নাকি ডাকসুর এই জোরালো প্রতিবাদে সচল হবে শনিবারের চাকা? উত্তর হয়তো আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই মিলবে, তবে সিনেট ভবনের সামনের সেই সন্ধ্যাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করল।

Advertisement
Advertisement
Advertisement