দীর্ঘ ৪ বছরের অবসান: প্রাণ ফিরছে দৌলতদিয়ার ৫নং ঘাটে, স্বস্তির অপেক্ষায় ২১ জেলা
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজবাবড়ী
পদ্মার ঢেউ আর পলিমাটির খেলায় দীর্ঘ চার বছর নিস্তব্ধ ছিল রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া প্রান্তের ৫নং ফেরিঘাটটি। যে পথে একসময় হাজারো যানবাহনের চাকা ঘুরত, সেখানে জমেছিল কেবল হতাশার বালুচর। অবশেষে সেই নীরবতা ভাঙছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই নৌরুটে পুনরায় সচল হচ্ছে ৫নং ফেরিঘাট। বিআইডব্লিউটিএ-এর তত্ত্বাবধানে পুরোদমে চলছে পুনঃনির্মাণের কাজ। এই ঘাটটি চালু হলে দীর্ঘদিনের যানজট আর ভোগান্তির অবসান ঘটবে বলে আশা করছেন যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্জন্ম
স্মৃতি হাতড়ালে ফিরে যেতে হয় ২০২২ সালে। ঘূর্ণিঝড় 'সিত্রাং'-এর প্রলয়ঙ্করী থাবায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল ৫নং ঘাট এলাকা। তীব্র নদী ভাঙন আর নাব্যতা সংকটের মুখে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ ঘাটটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে দীর্ঘ চার বছর এটি অকেজো পড়ে ছিল। ৭টি ঘাটের মধ্যে মাত্র ৩টি (৩, ৪ ও ৭নং) দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল বিশাল এই নৌরুটের কার্যক্রম। ফলে ঈদ কিংবা সাধারণ ছুটির দিনে দৌলতদিয়া প্রান্তে তৈরি হতো মাইলের পর মাইল যানবাহনের সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় নাভিশ্বাস উঠত অসুস্থ রোগী, নারী ও শিশুদের।
কর্মসংস্থানের নতুন স্বপ্ন
৫নং ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায় শ্রমিকদের ব্যস্ততা। কেউ পাইলিং করছেন, কেউ সংযোগ সড়ক মেরামতে ব্যস্ত। এই কর্মযজ্ঞ দেখে চোখেমুখে খুশির ঝিলিক স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। ঘাটের পাশের মাছ ব্যবসায়ী চান্দু মোল্লা বলেন,
"ঘাটটা বন্ধ হওয়ায় আমরা ভিটেছাড়া হওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। এখন সংস্কার হচ্ছে শুনে খুব ভালো লাগছে। ঘাট চালু হলে এখানে আবার খাবার হোটেল, চায়ের দোকান জমবে। অনেক বেকার মানুষের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হবে।"
অব্যবস্থাপনার ছাপ ও প্রত্যাশা
দৌলতদিয়া ঘাটের বর্তমান চিত্র কিছুটা অম্লমধুর। ৭টি ঘাটের মধ্যে ৫নং ঘাটটি ফিরলেও ১ ও ২নং ঘাট নিয়ে রয়েছে ক্ষোভ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী সিমেন্ট কোম্পানিগুলো এই সরকারি ঘাট দুটি দখল করে নিজেদের মালামাল লোড-আনলোডের কাজে ব্যবহার করছে। প্রতি বছর সংস্কারের বরাদ্দ আসলেও দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয় না।
সবুজ হোসেন নামের এক নিয়মিত যাত্রী বলেন, "ব্যবসার কাজে মাসে অন্তত একবার ঢাকা যেতে হয়। ৩টি ঘাটে লোড নিতে যে সময় লাগে, ৪টি ঘাট হলে সেই চাপ অনেকটা কমবে। তবে আমাদের দাবি, দখল হওয়া ঘাটগুলোও যেন উদ্ধার করা হয়।"
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সালাহ উদ্দিন জানান, ৫নং ঘাটটি চালু করা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন,
"সিত্রাং-এর পর থেকে আমরা অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করেছি। বিআইডব্লিউটিএ ঘাটটি পুনঃনির্মাণের কাজ শুরু করায় আমাদের সক্ষমতা অনেক বাড়বে। আশা করছি, খুব দ্রুতই আমরা যানবাহনের চাপ সামলাতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারব।"
৫নং ঘাটটি চালু হলে কেবল পারাপারের গতিই বাড়বে না, বরং ঝিমিয়ে পড়া দৌলতদিয়া বন্দরে আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে। সাধারণ মানুষের এখন একটাই চাওয়া—দ্রুত কাজ শেষ করে ঘাটটি যেন যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।