তিলোত্তমার আড়ালে নির্বাসিত জনপদ: বাঁশের সাঁকো আর জলাবদ্ধতায় বন্দি দক্ষিণের ১৮ ওয়ার্ড

 প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ০৩:১১ অপরাহ্ন   |   রাজশাহী

তিলোত্তমার আড়ালে নির্বাসিত জনপদ: বাঁশের সাঁকো আর জলাবদ্ধতায় বন্দি দক্ষিণের ১৮ ওয়ার্ড

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​রাজধানীর আকাশচোঁয়া অট্টালিকা আর ঝলমলে আলোকচ্ছটার ঠিক পাশেই যেন থমকে আছে এক আদিম জনপদ। যেখানে ভোরের আলো ফুটলে নাগরিক ব্যস্ততা নয়, বরং শুরু হয় টিকে থাকার লড়াই। বায়ান্ন বাজার তিপান্ন গলির ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকা থেকে কিছুটা এগোলেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন বাস্তবতা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মানচিত্রে যা আধুনিক নগরের অংশ হিসেবে চিহ্নিত, বাস্তবে তা যেন এক ভুলে যাওয়া উপাখ্যান। নাসিরাবাদ থেকে শুরু করে সারুলিয়া—এই ১৮টি বর্ধিত ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের কাছে ‘সিটি করপোরেশন’ শব্দটি কেবল ট্যাক্সের রসিদেই সীমাবদ্ধ, নাগরিক সুবিধায় নয়।

​নগরের ক্রমবর্ধমান জনচাপ সামলাতে ২০১৭ সালে নাসিরাবাদ ইউনিয়নসহ মোট ১৮টি নতুন এলাকাকে ডিএসসিসির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ৯ বছর পার হয়ে গেলেও এই বিশাল জনপদে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। এখানকার মেঠোপথগুলো এখনও পিচ ঢালাইয়ের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। সবচেয়ে করুণ দৃশ্য দেখা যায় নাসিরাবাদের ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানে বিশাল জলাধার পার হতে আধুনিক কোনো সেতু নেই; গ্রামবাংলার সেই পুরনো বাঁশের সাঁকোই এখনও হাজার হাজার মানুষের একমাত্র ভরসা। কোনো অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে কিংবা জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স ডাকলে তা প্রধান সড়কের অনেক দূরেই থমকে যায়। কাঁধে করে রোগীকে সাঁকো পার করে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এখানে নিত্যদিনের।

​একটু বৃষ্টি হলেই এই অঞ্চলের রূপ বদলে যায় এক বিভীষিকাময় জনপদে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও কালভার্ট না থাকায় সামান্য বর্ষণেই রাস্তাঘাট তলিয়ে কোমর সমান পানি হয়ে যায়। বিশেষ করে ৬৩ থেকে ৬৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের জীবন যেন এক স্থবির জলবন্দি খাঁচায় আটকে পড়ে। নর্দমার নোংরা জল আর বৃষ্টির পানি মিলেমিশে একাকার হয়ে ছড়ায় দুর্গন্ধ ও চর্মরোগ। স্থানীয়দের আক্ষেপ, তারা নিয়মিত সিটি করপোরেশনের কর পরিশোধ করছেন, অথচ বিনিময়ে পাচ্ছেন অন্ধকার রাস্তা আর কাদা-জলের যন্ত্রণা। রাতের বেলা অধিকাংশ সড়কে বাতি জ্বলে না, ফলে মেঠোপথের অন্ধকার চিরে ঘরে ফেরাই এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

​অবহেলিত এই জনপদের জনপ্রতিনিধিদের কণ্ঠেও ঝরছে চরম অসহায়ত্ব। ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের মতে, প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষের এই বিশাল বসতিকে এভাবে নাগরিক সুবিধার বাইরে রাখা অমানবিক। তিনি জানান, পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর বরাদ্দের অভাবে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি।

​প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশার বাণী শোনানো হলেও তা কত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে সন্দিহান ভুক্তভোগীরা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম জানান, বিশাল এই এলাকায় রাস্তা, বিদ্যুৎ ও ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য বড় অংকের অর্থের প্রয়োজন। সরকারের কাছে বরাদ্দের আবেদন জানানো হয়েছে; অর্থ ছাড় পেলেই দ্রুত গতিতে কাজ শুরু হবে।

​শহর মানে কেবল ইট-পাথর আর কংক্রিটের জঙ্গল নয়, শহর মানে মানুষের স্বস্তি ও নিরাপত্তা। কিন্তু তিলোত্তমা ঢাকার কোল ঘেঁষেই গড়ে ওঠা এই অবহেলিত ওয়ার্ডগুলো যেন প্রদীপের নিচেই এক গভীর অন্ধকার। করপোরেট নগরের চাকচিক্যের আড়ালে এই ১৮টি ওয়ার্ডের লাখ লাখ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আধুনিক নগরায়ণের সুফল কি তবে কেবল নির্দিষ্ট কিছু সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এই বঞ্চিত গলির বাসিন্দারা কবে এক চিলতে পাকা রাস্তা আর জলাবদ্ধতামুক্ত জীবনের স্বাদ পাবেন, সেই উত্তর আজও অজানাই রয়ে গেছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement