শূন্য স্টোররুম, বিপন্ন অধিকার: টাঙ্গাইলের স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা
নিজস্ব প্রতিবেদক | টাঙ্গাইল
আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই, তাই দুই সন্তানের পর নতুন করে মাতৃত্বের ঝুঁকি নিতে চান না ইয়াসমিন বেগম। স্থায়ী পদ্ধতিতে ভয় থাকায় ভরসা করেছিলেন সরকারি জন্মনিরোধক সামগ্রীর ওপর। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে তাকে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। ইয়াসমিনের ভাষায়, "দোকানে পিলের দাম অনেক, আমাদের মতো দিনমজুরের সংসারে সেই টাকা জোগানো বিলাসিতা। এখন ভয়ে থাকি, আবার কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বোঝা ঘাড়ে চাপে কি না।"
এটি কেবল কোনো একক ব্যক্তির সংকট নয়; বরং টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলার ৮১টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের বর্তমান চিত্র। যেখানে সাধারণ রোগের ওষুধ তো দূরের কথা, প্রাথমিক জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীও মিলছে না দুই বছর ধরে।
তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধস
নব্বইয়ের দশকে গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে তৈরি হয়েছিল সুদৃশ্য ভবন। লক্ষ্য ছিল—গর্ভবতী মায়েদের সেবা, শিশু চিকিৎসা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু বর্তমানে এই ভবনগুলো অনেকটা 'প্রাণহীন খাঁচায়' পরিণত হয়েছে। মাঠকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা বাড়ালেও, কেন্দ্রে এসে মানুষ যখন ওষুধ পায় না, তখন তৈরি হচ্ছে চরম ক্ষোভ ও অবিশ্বাস।
এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতি:
সরবরাহহীনতা: টানা ৬ মাস ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী (পিল, ইনজেকশন) এবং সাধারণ ওষুধ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ।
ঝুঁকি: নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিকল্পের অভাব: বাইরের ফার্মেসিতে এসব সামগ্রীর দাম চড়া হওয়ায় দিনমজুর ও শ্রমিক শ্রেণির মানুষ তা কিনতে পারছেন না।
অসহায় মাঠকর্মী ও চিকিৎসকরা
মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, মানুষ এখন সচেতন হয়েছে, তারা সেবা নিতে কেন্দ্রে আসে। কিন্তু স্টোর খালি থাকায় তাদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। গোপালপুর উপজেলার মেডিক্যাল অফিসার ডা. শারমীন আখতারের মতে, বিষয়টি অত্যন্ত দুশ্চিন্তার। অস্থায়ী পদ্ধতিগুলো বন্ধ থাকায় মানুষ এখন এক প্রকার নিরুপায় হয়ে পড়েছে।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নীরবতা
কেন এই সরবরাহ সংকট? টাঙ্গাইল জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক আব্দুল লতিফ মোল্লা স্বীকার করেছেন যে, দুই বছর যাবৎ সরবরাহ অনিয়মিত। তবে এর সমাধান কবে হবে, সেই উত্তর তার কাছে নেই। অধিদপ্তর বলছে, "চেষ্টা চলছে"—কিন্তু সেই চেষ্টার সুফল এখনো পৌঁছায়নি ইয়াসমিনদের হাতে।
পরিশেষে, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু টাঙ্গাইলের এই ৮১টি কেন্দ্রে ওষুধের আকাল প্রমাণ করে যে, শেকড় পর্যায়ের মানুষের এই অধিকার আজ কতটা অবহেলিত। দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে জনস্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ—উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রকে চরম মূল্য দিতে হতে পারে।