দেশের মানচিত্রে নতুন দিগন্ত: বগুড়া এখন সিটি করপোরেশন, যুক্ত হলো আরও ৫ উপজেলা
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ৭ মে, ২০২৬
বাংলাদেশের প্রশাসনিক মানচিত্রে আজ এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হলো। উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর বগুড়া দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর লাভ করল সিটি করপোরেশনের মর্যাদা। একইসঙ্গে দেশের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে গঠন করা হয়েছে আরও পাঁচটি নতুন উপজেলা। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি’র (নিকার) ১২০তম বৈঠকে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
উন্নয়নের নতুন সোপান: বগুড়া সিটি করপোরেশন
বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এই প্রাচীন ও সমৃদ্ধ শহরটিকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা। আজকের বৈঠকের সিদ্ধান্তের পর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিল। এখন থেকে এই জনপদ কেবল একটি পৌরশহর নয়, বরং উন্নত নাগরিক সুবিধা সম্বলিত একটি আধুনিক মেট্রোপলিটন এলাকা হিসেবে বিকশিত হওয়ার আইনি ভিত্তি পেল। রাস্তাঘাট উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত নগরায়নের মাধ্যমে বগুড়া এখন উত্তরের প্রধান অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসনে নতুন নাম
প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে নিকার-এর এই বৈঠকে পাঁচটি নতুন উপজেলা গঠনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। যার প্রতিটিই দীর্ঘদিনের জনদাবীর প্রতিফলন।
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলাকে বিভক্ত করে গঠন করা হয়েছে নতুন ‘মোকামতলা’ উপজেলা। ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মোকামতলা এখন থেকে নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন নগরী কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলাকে ভেঙে তৈরি করা হয়েছে ‘মাতামুহুরী’ উপজেলা। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনিক এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটাবে।
উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে একযোগে দুটি নতুন উপজেলা যুক্ত হয়েছে। সদর উপজেলাকে পুনর্বিন্যাস করে তৈরি করা হয়েছে ‘রুহিয়া’ ও ‘ভুল্লী’ উপজেলা। কৃষিপ্রধান এই জনপদের মানুষের জন্য এখন জেলা সদরের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজ এলাকাতেই সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া সহজতর হবে।
এদিকে উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে সদর উপজেলাকে ভাগ করে গঠন করা হয়েছে ‘চন্দ্রগঞ্জ’ উপজেলা। বৃহত্তর এই জনপদটি আগে থেকেই বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহন করত, এখন উপজেলা হিসেবে এটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক রূপ পেল।
বিকেন্দ্রীকরণের পথে একধাপ এগিয়ে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জনগণের সুবিধার ওপর। নিকার-এর ১২০তম এই বৈঠক শেষে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এই নতুন প্রশাসনিক ইউনিটগুলো গঠনের ফলে স্থানীয় সরকার কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে। পুলিশিং ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ভূমি অফিস এবং স্বাস্থ্য সেবা—সবই এখন সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে।
বগুড়া সিটি করপোরেশন এবং নতুন পাঁচটি উপজেলার এই ঘোষণা আসার পর সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে আনন্দের জোয়ার বইছে। সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, এটি কেবল সীমানা নির্ধারণ নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়নের একটি বড় পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, এই নতুন প্রশাসনিক কাঠামোগুলো কত দ্রুত পূর্ণাঙ্গ জনবল ও অবকাঠামো নিয়ে তাদের যাত্রা শুরু করতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে আজকের এই দিনটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসের পাতায় একটি বিশেষ মাইলফলক হয়ে থাকবে।