নিস্তব্ধ কাপাসিয়া: এক ভোরে ফুরিয়ে গেল ৫টি প্রাণ
কাপাসিয়া, (গাজীপুর) প্রতিনিধি
রাত তখন গভীর। প্রকৃতি যখন নিঝুম ঘুমে মগ্ন, ঠিক তখনই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে হানা দিয়েছিল যমদূত। কাপাসিয়ার শান্ত জনপদে নেমে এল শ্মশানের নীরবতা। ভাড়া বাসায় একই পরিবারের ৫ সদস্যকে গলাকেটে হত্যার মধ্য দিয়ে দুর্বৃত্তরা আজ যে বীভৎসতার স্বাক্ষর রাখল, তা দেখে স্তম্ভিত খোদ আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীও। গোপালগঞ্জ থেকে আসা এক পরিবারের সুন্দর আগামীর স্বপ্ন আজ বিলীন হয়ে গেছে কাপাসিয়ার এক রক্তভেজা মেঝেতে।
রক্তের দাগে শুরু হওয়া সকাল
শনিবার (৯ মে) ভোরের আলো তখনও ঠিকমতো ফোটেনি। আশপাশের মানুষ যখন দৈনন্দিন কাজে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ওই বাড়ি থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন প্রতিবেশীরা। খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিতেই আঁতকে ওঠেন তারা। ঘরের ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নিথর দেহ। বীভৎসভাবে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে স্বামী, স্ত্রী ও তাদের ফুটফুটে তিন কন্যাকে। মুহূর্তেই এই খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। শত শত মানুষের ভিড় জমে সেই অভিশপ্ত বাড়ির আঙিনায়।
নিহতদের পরিচয় ও প্রেক্ষাপট
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত পরিবারটি আদতে গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। কর্মসংস্থানের তাগিদে তারা কাপাসিয়ায় এসে ভাড়া বাড়িতে বসবাস শুরু করেছিলেন। নিহতের তালিকায় রয়েছেন পরিবারের কর্তা, তার স্ত্রী এবং তাদের তিন শিশু কন্যা। প্রতিবেশীরা জানান, অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের এই পরিবারটির সাথে কারও কোনো প্রকাশ্য বিরোধের কথা জানা ছিল না। ছোট ছোট তিনটি প্রাণের অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পুলিশি তৎপরতা ও প্রাথমিক তদন্ত
ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় কাপাসিয়া থানা পুলিশ। কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুর আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান:
"খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করেছি। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও ফরেনসিক দল আলামত সংগ্রহের কাজ করছে। প্রাথমিক আলামত দেখে মনে হচ্ছে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।"
পুলিশ জানায়, মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে এটি ডাকাতির উদ্দেশ্যে নাকি কোনো পুরনো শত্রুতার জের, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না প্রশাসন।
বিচারহীনতার আতঙ্ক ও শেষ আকুতি
এলাকাবাসীর দাবি, এমন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড আগে কখনো এই অঞ্চলে ঘটেনি। মানুষের মনে এখন কাজ করছে চরম আতঙ্ক। জনাকীর্ণ এলাকায় একটি সাজানো গোছানো পরিবারকে এভাবে নিঃশেষ করে দেওয়ার ঘটনায় অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ।
একটি পরিবারের পাঁচটি স্বপ্নের সমাধি হলো আজকের এই ভোরে। ঘাতকের চাপাতির আঘাতে স্তব্ধ হয়ে গেল তিন শিশুর কলকাকলি। তদন্ত শেষে বেরিয়ে আসবে মূল রহস্য, কিন্তু যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, তার সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই কারোরই।