চুক্তির আগেই দড়ি টানাটানি: রাজধানীর খেলার মাঠ ও সড়ক এখন ইজারাদারদের কবজায়

 প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

চুক্তির আগেই দড়ি টানাটানি: রাজধানীর খেলার মাঠ ও সড়ক এখন ইজারাদারদের কবজায়

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​শহরের ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি শৈশবের এক চিলতে নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা ওই খেলার মাঠগুলো। যেখানে বিকেল হলেই একঝাঁক শিশু-কিশোর মেতে উঠত ফুটবল কিংবা ক্রিকেটে, সেখানে আজ বলের বদলে হাতুড়ি-শাবলের শব্দ। এখনো ইজারার আইনি প্রক্রিয়া শেষ হয়নি, বসেনি চূড়ান্ত স্বাক্ষরের মোহর—অথচ তার আগেই রাজধানীর বুক চিরে বিভিন্ন খেলার মাঠ ও জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক দখল করে নিতে শুরু করেছেন প্রভাবশালী ইজারাদাররা। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই চলছে পশুর হাটের খুঁটি পোঁড়ার উৎসব।

​শৈশব যখন খুঁটিবদ্ধ

​তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট খেলার মাঠের চিত্রটি এখন করুণ। বিকেলে যেখানে কিশোরদের কলকাকলিতে মুখর থাকার কথা, সেখানে এখন ট্রাকভর্তি বাঁশ আর ত্রিপল নামছে। স্থানীয় এক কিশোর বিষণ্ণ মনে বল হাতে মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখছিল, কীভাবে তার খেলার জায়গাটি দখল হয়ে যাচ্ছে। তার ভাষ্য, "ঈদের তো অনেক দেরি, এখনই মাঠ বন্ধ করে দিলে আমরা খেলব কোথায়?"

​একই দৃশ্য দক্ষিণ সিটির আমুলিয়া এবং গ্রিন বনশ্রী হাউজিং এলাকাতেও। সেখানেও সর্বোচ্চ দরদাতার নাম ঘোষণা হতে না হতেই শুরু হয়ে গেছে দখলদারিত্ব। অথচ সিটি করপোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী, চুক্তির আগে তো বটেই, এমনকি কোরবানির ঈদের তিন-চার দিনের বেশি আগে কোনোভাবেই হাটের প্রস্তুতি শুরু করার সুযোগ নেই।

​শর্তের আড়ালে অনিয়মের মহোৎসব

​তথ্য বলছে, এ বছর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ১৫টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ১১টি অস্থায়ী পশুর হাট বসার কথা। এর মধ্যে অনেকগুলোর দরপত্র প্রক্রিয়া এখনো ঝুলে আছে। অথচ বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তত ১২ দিন আগে থেকেই মাঠ ও সড়ক দখল শুরু করা ইজারা শর্তের সরাসরি লঙ্ঘন।

​নগরপরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান এই পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করে বলেন:

​"ঢাকা শহরে মাঠের এমনিতেই হাহাকার। বারবার বলা সত্ত্বেও সিটি করপোরেশন খেলার মাঠগুলোকে হাটের বাইরে রাখার ন্যূনতম সদিচ্ছা দেখাচ্ছে না। তার ওপর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে মাঠ দখল করে রাখা শিশুদের অধিকারের ওপর চরম আঘাত।"

​প্রশাসনের হুঁশিয়ারি বনাম বাস্তবতা

​জনভোগান্তির এই চিত্র নিয়ে দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসকরা কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, "আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি, নির্দিষ্ট সময়ের আগে হাট বসতে পারবে না। সীমানার বাইরে গেলে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।"

​অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, মাত্র চার দিনের জন্য হাট বসানোর শর্ত দেওয়া হয়। বর্জ্য অপসারণ ও জনদুর্ভোগ রোধেও রয়েছে কঠোর নির্দেশনা।

​'অনিয়মই যেখানে নিয়ম'

​তবে নগরবাসীর কণ্ঠে ঝরছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অবিশ্বাস। সাধারণ মানুষের মতে, প্রতি বছরই কাগজের কলমে কঠোর নিয়মের কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখা যায় না। ফলে অতীতে শাস্তি না হওয়ায় এই অনিয়মই এখন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

​যথাযথ তদারকি না থাকলে এবারও কোরবানির ঈদের আগে রাজধানীর সড়ক ও মাঠগুলো ইজারাদারদের 'স্বৈরাচারী' দখলের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য নরকযন্ত্রণা হয়ে উঠবে—এমনটাই আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Advertisement
Advertisement
Advertisement