মেঘলা আকাশের নিচে নিশ্বাস যখন সতর্কবার্তা: ঢাকার বাতাসের সাতসকাল
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
ভোরের আলো ফোটার আগেই গত কয়েকদিনের এক পশলা বৃষ্টি নাগরিক জীবনে কিছুটা স্বস্তি এনেছিল। ধুলোবালির আস্তরণ ধুয়ে যাওয়া রাজপথ আর গাছের পাতায় জমাটবদ্ধ সবুজের আভা দেখে মনে হয়েছিল, মেগাসিটি ঢাকা বুঝি তার হারানো প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ শনিবারের সকালটি যখন উঁকি দিল, তখন আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্য বলছে অন্য কথা। বৃষ্টির আর্দ্রতায় ধুলোবালি কিছুটা থিতিয়ে এলেও ঢাকার বাতাস এখনো পুরোপুরি নির্মল হয়ে ওঠেনি। আজ সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ঢাকার বায়ুমানের স্কোর ছিল ১৩২, যা বৈশ্বিক তালিকায় আমাদের চতুর্থ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
প্রকৃতির এই লুকোচুরি খেলায় সাধারণ মানুষের জন্য আবহাওয়া সহনীয় মনে হলেও, এটি আসলে এক মৃদু সতর্কবার্তা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৩২ স্কোরটি ‘সতর্কতামূলক’ অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, ঘরের বাইরে বের হওয়া সাধারণ মানুষের জন্য বড় কোনো ঝুঁকি আপাতত না থাকলেও, যারা শারীরিকভাবে কিছুটা সংবেদনশীল—যেমন শিশু, বয়োবৃদ্ধ কিংবা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিরা—তাদের জন্য এই বাতাস এখনো অস্বাস্থ্যকর।
ঢাকার আকাশ যখন এই দোলাচলে মগ্ন, তখন এশিয়ার অন্যান্য মেগাসিটির চিত্রটি আরও কিছুটা ধূসর। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা আজ দূষণের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে ১৯৫ স্কোর নিয়ে, যা রীতিমতো জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের লাহোর এবং ভারতের দিল্লিও খুব একটা পিছিয়ে নেই; যথাক্রমে ১৮৬ ও ১৬৬ স্কোর নিয়ে শহর দুটি ধুঁকছে দূষণের তীব্রতায়। তবে আশার কথা হলো, ভারতেরই মুম্বাই কিংবা পাকিস্তানের করাচির বাসিন্দারা আজ তুলনামূলক স্বচ্ছ বাতাস নিতে পারছেন, যেখানে দূষণের মাত্রা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত।
বায়ুমানের এই মানদণ্ড বা একিউআই স্কোর একটি অদ্ভুত মাপকাঠি। যখন এটি শূন্য থেকে ৫০-এর ঘরে থাকে, তখন নাগরিকরা প্রাণভরে নিশ্বাস নিতে পারেন। কিন্তু স্কোর যখনই ১০০ ছাড়িয়ে যায়, তখনই শুরু হয় অদৃশ্য বিপদের হাতছানি। বিশেষ করে স্কোর যখন দুশ বা তিনশর ঘর স্পর্শ করে, তখন চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন ঘরের জানালা বন্ধ রেখে ভেতরেই অবস্থান করতে। কারণ সেই বাতাস কেবল নিশ্বাস নয়, বয়ে আনে রোগব্যাধির এক অদৃশ্য মিছিল।
আজকের ঢাকার এই নাতিশীতোষ্ণ এবং কিছুটা ধূসর সকালটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কয়েক পশলা বৃষ্টি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদী দূষণমুক্ত বাতাসের জন্য আমাদের আরও অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের ধোঁয়া আর কলকারখানার কর্মব্যস্ততায় এই বায়ুমান আরও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই সকালের এই আপাত ‘ভালো’ আবহাওয়াকে ধ্রুব ধরে না নিয়ে, সংবেদনশীল মানুষদের জন্য বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনই হতে পারে আজকের দিনের সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।
বৃষ্টিভেজা এই শহরে নিশ্বাস নিতে নিতে নগরবাসী হয়তো প্রার্থনা করছেন এমন এক সকালের, যেখানে আইকিউএয়ারের কাঁটাটি থমকে থাকবে সবুজের ঘরে, আর প্রতিটি নিশ্বাস হবে সংশয়হীন।