ঘর ভাঙছে, মন ভাঙছে: সর্বনাশা পদ্মা-যমুনার গ্রাসে মানিকগঞ্জের নিঃস্ব জনপদ

 প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ০৮:২৩ পূর্বাহ্ন   |   ঢাকা

ঘর ভাঙছে, মন ভাঙছে: সর্বনাশা পদ্মা-যমুনার গ্রাসে মানিকগঞ্জের নিঃস্ব জনপদ

​নিজস্ব প্রতিবেদক, মানিকগঞ্জ:

​অসময়ে রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে প্রমত্তা পদ্মা ও যমুনা। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদীর বুক চিরে বইছে তীব্র স্রোত, আর সেই স্রোতের আঘাতেই তছনছ হয়ে যাচ্ছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর, শিবালয় ও দৌলতপুর উপজেলার তীরবর্তী জনপদ। নদীর বাম তীরের বিস্তীর্ণ জনপদে এখন শুধুই কান্নার রোল। একের পর এক আবাদি জমি আর সাজানো বসতভিটা মুহূর্তের মধ্যেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে।

​মালঞ্চি থেকে শুরু করে চরকাটারি—নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোতে এখন চরম হাহাকার। কেউ গোয়ালঘর থেকে গরু বের করছেন, কেউবা ঘর ভেঙে চালের টিনগুলো আঁকড়ে ধরার শেষ চেষ্টা করছেন। চোখেমুখে এক রাশ অনিশ্চয়তা নিয়ে নদীপাড়ের মানুষগুলো এখন যাযাবর। গত বছর সাময়িকভাবে ফেলা জিও ব্যাগগুলো রাক্ষুসে নদীর পেটে চলে গেছে অনেক আগেই। যাদের সম্বল বলতে এখন শুধু কয়েক হাত জমি বাকি ছিল, রাক্ষুসে নদী তাও কেড়ে নিচ্ছে নির্দয়ভাবে।

​পদ্মা পাড়ের বাসিন্দা রফিক মিয়ার চোখে এখন কেবলই শূন্যতা। তিন তিনবার ঘর হারিয়েছেন তিনি। ক্ষোভ আর বিষণ্ণতা মেশানো কণ্ঠে তিনি বলেন, "ছোটবেলা থেইকা শুইন্যা আসতাছি বাঁধ হইব, কিন্তু সবই খালি কথার কথা। আবারও ঘর ভাঙতাছে, এহন যামু কই?" একই হাহাকার পঞ্চাশোর্ধ্ব রহিমা বেগমের কণ্ঠেও। জীবনের সবটুকু সুখ নদী গিলে খেয়েছে, এখন অবশিষ্ট সামান্য ভিটেটুকুও নদীর অতলে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য তাকে নির্বাক করে দিয়েছে। স্থানীয়রা আক্ষেপ করে বলছেন, ভোটের আগে কত প্রতিশ্রুতি আসে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।

​মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান জানান, জেলার ১৪টি পয়েন্টে ভাঙন শুরু হয়েছে। বর্তমানে হাতে থাকা সামান্য বরাদ্দ দিয়ে কুশিয়ার চর ও তেওতা এলাকায় আপৎকালীন জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, স্থায়ী বাঁধের জন্য চারটি বড় প্রকল্প সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

​এদিকে মানিকগঞ্জ-১ ও ২ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর ও মঈনুল ইসলাম খান শান্ত জানান, তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে স্থায়ী বাঁধের দাবি জানিয়েছেন এবং শুষ্ক মৌসুমে বড় ধরনের কাজ শুরু হবে বলে আশাবাদী। তবে সেই শুষ্ক মৌসুম আসা পর্যন্ত নদীপাড়ের এই নিঃস্ব মানুষগুলোর ঘর আর টিকে থাকবে কি না, সেই উত্তর কারো জানা নেই। নদীর প্রবল গর্জন আর পাড় ভাঙার শব্দে ঘুম হারাম হওয়া হাজারো মানুষের এখন একটাই চাওয়া—আশ্বাস নয়, চাই টেকসই এক স্থায়ী বাঁধ।

Advertisement
Advertisement
Advertisement