লেবাননের যুদ্ধে নিভে গেল ফরিদপুরের প্রদীপ: চোখের জলে দিপালীকে বিদায়
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা:
ভয়াল যুদ্ধের লেলিহান শিখা যখন সুদূর লেবাননের আকাশকে লাল করে তুলেছিল, তখনো কেউ ভাবেনি সেই আগুনের আঁচ এসে লাগবে ফরিদপুরের এক নিভৃত পল্লীর সাধারণ ঘরে। অভাবের তাড়নায় এগারো বছর আগে যে মেয়েটি বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, আজ তিনি ফিরলেন নিথর দেহে, কফিনে বন্দি হয়ে। বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত সেই দিপালী আক্তারের মরদেহ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে যখন ঢাকার মাটিতে স্পর্শ করল, তখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল স্বজনদের কান্নায়।
২০১১ সালের কথা। সোনালি স্বপ্ন দুচোখে মেখে লেবাননে গিয়েছিলেন দিপালী। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পরিবারের জন্য সুখ কিনে পাঠাতেন তিনি। কিন্তু গত ৮ এপ্রিলের এক অভিশপ্ত বিকেল সবকিছু তছনছ করে দেয়। বৈরুতের একটি বহুতল ভবনে কাজ করার সময় ইসরায়েলি বিমান হামলার শিকার হন তিনি। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে গুরুতর আহত দিপালীকে উদ্ধার করে ভর্তি করা হয়েছিল রফিক হারিরি হাসপাতালে। চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন, কিন্তু জীবন ও মৃত্যুর লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় তাকে।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টায় যখন মরদেহ বহনকারী বিমানটি অবতরণ করে, তখন সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সরকারের পক্ষে মরদেহ গ্রহণ করতে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে শোকার্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, "কোনো কিছু দিয়েই আমরা দিপালীকে আর আমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনতে পারব না। তবে প্রধানমন্ত্রী সবসময় প্রবাসীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। যুদ্ধের ময়দান থেকে এভাবে প্রতিটি প্রাণ হারিয়ে যাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থির পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত আটজন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে দিপালীসহ ছয়জনের দেহ স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা থেকে মরদেহ ফিরিয়ে আনার আইনি জটিলতা এবং ফ্লাইট সঙ্কটের কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও সরকার প্রতিটি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বদ্ধপরিকর।
দিপালীর মরদেহ যখন বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফরিদপুরের পথে রওনা হয়, তখন মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু কান্নার সুরই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। যে মেয়েটি রঙিন স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন, তিনি আজ ফিরছেন গ্রামবাংলার মাটির কোলে চিরনিদ্রায় শায়িত হতে। যুদ্ধের ভয়াবহতা কীভাবে এক লহমায় একটি পরিবারের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে, দিপালী আক্তার আজ তার এক করুণ সাক্ষী হয়ে রইলেন। দিপালীর আত্মার মাগফেরাত কামনা করে সরকার তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
এক নজরে পরিসংখ্যান-নিহত দিপালীর গ্রাম-ফরিদপুর। লেবাননে গমন- ২০১১ সাল। হামলার তারিখ- ৮ এপ্রিল। মোট নিহত বাংলাদেশ- ৮ জন। দেশে আসা মরদেহের সংখ্যা- ৬ জন।