শুদ্ধি অভিযানে ধরাশায়ী দুই জেনারেল: চীনের সামরিক ইতিহাসে নজিরবিহীন সাজা ​আন্তর্জাতিক ডেস্ক

 প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১০:১৪ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

শুদ্ধি অভিযানে ধরাশায়ী দুই জেনারেল: চীনের সামরিক ইতিহাসে নজিরবিহীন সাজা ​আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেক্স নিউজ:

​চীনের সামরিক বাহিনীর অন্দরে দীর্ঘদিনের ঘুণপোকা সরাতে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছিলেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, তার চূড়ান্ত এবং কঠোরতম রূপ দেখল বিশ্ব। ঘুষ গ্রহণ ও দুর্নীতির দায়ে চীনের দুই সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ওয়েই ফেংহে এবং জেনারেল লি শাংফুকে দুই বছরের স্থগিতাদেশসহ মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে দেশটির একটি সামরিক আদালত। বৃহস্পতিবার এক সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনে এই ঐতিহাসিক রায়ের খবরটি প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া।

​এই দুই জেনারেলের পতন কেবল একটি বিচারিক প্রক্রিয়া নয়, বরং বেইজিংয়ের ক্ষমতার অলিন্দে বড় ধরনের ওলটপালটের ইঙ্গিত। জেনারেল ওয়েই ফেংহে এবং জেনারেল লি শাংফু দুজনেই ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ পদমর্যাদার কর্মকর্তা। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল গুরুতর—জেনারেল ওয়েই ফেংহে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, আর জেনারেল লি শাংফুর অপরাধ আরও এক ধাপ এগিয়ে; তিনি শুধু ঘুষ নেননি, বরং অন্যদের ঘুষ দিয়েছেন বলেও প্রমাণিত হয়েছে।

​চীনা বিচার ব্যবস্থায় ‘দুই বছরের স্থগিতাদেশসহ মৃত্যুদণ্ড’ কথাটির একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সাধারণত এই সময়ের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি কারাগারে সংশোধনমূলক আচরণ প্রদর্শন করেন, তবে তার প্রাণদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করা হয়। ফলে এই দুই সাবেক প্রভাবশালী জেনারেলকে সম্ভবত তাদের বাকি জীবন চার দেয়ালের মাঝেই কাটাতে হবে।

​চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সামরিক বাহিনী ও সরকারের ভেতর থেকে দুর্নীতি এবং ‘আনুগত্যহীনতা’ নির্মূলে আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর তথ্যমতে, এই অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০০ জন শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তা বরখাস্ত হয়েছেন অথবা জনসমক্ষ থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছেন।

​বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘রকেট ফোর্স’ বা ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটে বড় ধরনের রদবদল এবং কর্মকর্তাদের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে, পর্দার আড়ালে বড় কোনো ঝড় ধেয়ে আসছে। জেনারেল ওয়েই এবং জেনারেল লি—দুজনেই এই শুদ্ধি অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। সামরিক আদালতে দেওয়া এই রায় মূলত চীনের বর্তমান নেতৃত্বের তরফ থেকে সশস্ত্র বাহিনীর বাকি সদস্যদের জন্য এক কড়া বার্তা: দুর্নীতির প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই, সে পদের উচ্চতা যতই হোক না কেন।

​বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তির শীর্ষ দুই কর্মকর্তার এমন পতন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে এটি যেমন শি জিনপিংয়ের ক্ষমতার ভিত আরও মজবুত হওয়ার প্রমাণ, অন্যদিকে এটি বেইজিংয়ের সামরিক উচ্চাভিলাষের পথে স্বচ্ছতা বজায় রাখার একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আপাতত, বেইজিংয়ের আকাশচুম্বী ক্ষমতার চূড়া থেকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ঠাঁই হওয়া এই দুই জেনারেলের গল্পটি আধুনিক চীনের ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement