মাদ্রাজ ডার্বি থেকে বিধানসভা: ‘থালা’র মলাটে ‘থালাপতি’র রাজনৈতিক মহাকাব্য
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৬-এর ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক মহাপ্রলয়ের সাক্ষী থাকল দক্ষিণ ভারত। একদিকে যখন বাংলার রাজনীতির মহীরুহ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটছে উত্তরের রাজনীতিতে, ঠিক তখনই দাক্ষিণাত্যের সূর্যোদয়ের দেশে এক নতুন ‘ব্লকবাস্টার’ গল্পের জন্ম দিলেন চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয়। তবে এই জয়ের নেপথ্যে কেবল রূপালি পর্দার ক্যারিশমা নয়, বরং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা খুঁজে পাচ্ছেন বাইশ গজের ‘ক্যাপ্টেন কুল’ মহেন্দ্র সিং ধোনির ছায়া। চেন্নাইয়ের রাজপথে এখন একটাই গুঞ্জন— ‘থালা’ ধোনির অদৃশ্য স্ট্র্যাটেজিতেই কি কিস্তিমাত করলেন ‘থালাপতি’ বিজয়?
তামিলাগা ভেট্ট্রি কাজাগাম (টিভিকে)-এর এই উত্থান যেন কোনো টানটান চিত্রনাট্যের ক্লাইম্যাক্স। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, তামিলনাড়ুর রাজনীতির চিরচেনা সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়ে বিজয়ের দল একক বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই অভাবনীয় সাফল্যের বীজ বপন করা হয়েছিল প্রায় বছরখানেক আগে, যখন ভারতের প্রখ্যাত ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর টিভিকের সঙ্গে যুক্ত হন। বিহারের ‘জন সুরাজ’ আন্দোলন ছেড়ে তামিল রাজনীতিতে পা রেখেই পিকে এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তামিলনাড়ুর মানুষের মন জয় করতে হলে তাকে ধোনির জনপ্রিয়তাকে স্পর্শ করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই তিনি সাজিয়েছিলেন ‘ইয়েলো আর্মি’র আদলে এক রাজনৈতিক ব্রিগেড।
পুরো প্রচারপর্বে ধোনি ফ্যাক্টরকে অত্যন্ত সুচারুভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। চেন্নাই সুপার কিংসের আইকনিক গান ‘হুইসেল পডু’ (হুইসেল বাজাও) স্লোগানকে কৌশলে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল টিভিকের নির্বাচনী প্রতীক ‘হুইসেল’-এর সঙ্গে। ফলে এমএ চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে ধোনির জন্য যে উন্মাদনা কাজ করে, সেই একই আবেগ উছলে পড়েছিল বিজয়ের জনসভাগুলোতে। নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে ‘থালা’ এবং ‘থালাপতি’ যেন এক অভিন্ন সত্তায় পরিণত হয়েছিল। মাঠের ধোনির ফিনিশিং যেমন সিএসকেকে খাদের কিনারা থেকে জেতায়, রাজনীতির ময়দানেও বিজয়ের শেষ মুহূর্তের ঝোড়ো প্রচার তেমনই কাজ করেছে।
তবে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেললেও বিজয় এখনো ‘ফিনিশিং লাইনের’ সামান্য পেছনে দাঁড়িয়ে। ১০৮টি আসন পেলেও ম্যাজিক ফিগার ১১৮ থেকে তিনি মাত্র কয়েক কদম দূরে। পরিস্থিতি এখন ঠিক আইপিএলের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ‘সুপার ওভার’-এর মতো। তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক পিচে এখন প্রয়োজন ঠান্ডা মাথার সমঝোতা আর জোটের কূটনীতি।
সিএসকে যেমন চাপের মুখে স্নায়ু ধরে রেখে শিরোপা ঘরে তোলে, বিজয়ও কি পারবেন ছোট দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের সেই চূড়ান্ত বৈতরণী পার করতে? নাকি ধোনির হেলিকপ্টার শটের মতো কোনো চমকপ্রদ রাজনৈতিক জোটের মাধ্যমে তিনি দক্ষিণের মসনদে নিজের রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন করবেন— এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা দেশ। তবে ফলাফল যাই হোক, ২০২৬-এর এই নির্বাচন প্রমাণ করে দিল, তামিলনাড়ুর হৃদয়ে ক্রিকেট আর সিনেমা যখন একবিন্দুতে মেলে, তখন তৈরি হয় এক অপরাজেয় ইতিহাস।