​জনপ্রিয় নয়, চাই ন্যায়বিচার: বিচারকদের প্রতি আইনমন্ত্রীর কড়া বার্তা

 প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ০১:৪১ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

​জনপ্রিয় নয়, চাই ন্যায়বিচার: বিচারকদের প্রতি আইনমন্ত্রীর কড়া বার্তা

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​সকালটা ছিল মেঘমুক্ত, বসন্তের শেষ আর গ্রীষ্মের আগমনে প্রকৃতির রূপ বদলের ক্ষণ। রাজধানীর বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে তখন পিনপতন নীরবতা। নবীন ও অভিজ্ঞ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের চোখেমুখে আগামীর সংকল্প। সেই গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে প্রধান অতিথির আসনে আসীন হলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি কেবল আইনের ধারা নয়, বরং বিচারকের অন্তরাত্মার স্বাধীনতার ওপর আলোকপাত করেন।

​শনিবার (৯ মে) সকালে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের ওরিয়েন্টেশন কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী বিচারকদের উদ্দেশে এক যুগান্তকারী ও সাহসী আহ্বান জানান। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, জনতুষ্টির সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

​"জনপ্রিয়তা নয়, সঠিক সিদ্ধান্তই বিচারকের ধর্ম"

​আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিচারিক স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, "একজন বিচারককে তার চিন্তা ও চেতনায় সবসময় স্বাধীন থেকে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। জনমানুষের আবেগ অনেক সময় সঠিক পথ নাও দেখাতে পারে, কিন্তু আইন ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই একজন প্রকৃত বিচারকের সার্থকতা।" তিনি বিচারকদের মনে করিয়ে দেন যে, জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের চেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় কঠিন হলেও সেটিই ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি।

​তীর্থস্থানে পরিণত হোক বিচারালয়

​সাম্প্রতিক সময়ে বিচার বিভাগের ওপর মানুষের ক্ষোভ ও অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণের ঘটনাগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে মন্ত্রী এক আবেগঘন আর্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "আমরা চাই গোটা বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ও ভরসা পুনপ্রতিষ্ঠিত হোক। জুডিশিয়ারির ওপর মানুষের বিশ্বাসের জায়গাটি হতে হবে ইস্পাতকঠিন। প্রত্যেক বিচারপ্রার্থী মানুষের কাছে প্রধান বিচারপতির বাসভবন থেকে শুরু করে প্রতিটি আদালত যেন একটি তীর্থস্থানের মতো পবিত্র ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়।"

​তিনি আরও যোগ করেন, "প্রতিষ্ঠানটি মানুষের ক্ষোভ বা প্রতিবাদের জায়গায় পরিণত হোক—এমন দৃশ্য আমরা আর দেখতে চাই না। বিচারকরা যখন সঠিক ও নিরপেক্ষ রায় দেবেন, তখন মানুষের মনে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আস্থার জায়গা তৈরি হবে।"

​কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধার আশ্বাস

​বিচারকদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও দাবির বিষয়ে মন্ত্রী সহমর্মিতা প্রকাশ করে বলেন, "আপনাদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে যা কিছু প্রয়োজন, সুপ্রিম কোর্ট এবং সরকার তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখবে। তবে বিনিময়ে জাতির প্রত্যাশা—স্বচ্ছতা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।"

​স্বচ্ছতা ও গতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ

​অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাদের বক্তব্যে বিচারিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনার তাগিদ দেন। তারা বলেন, মামলাজট নিরসন এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও পেশাদারিত্বের কোনো বিকল্প নেই।

​অনুষ্ঠান শেষে হলরুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নবীন কর্মকর্তাদের চোখেমুখে দেখা যায় নতুন উদ্দীপনা। মন্ত্রীর সেই অমোঘ মন্ত্র—‘জনপ্রিয়তা নয়, সঠিক সিদ্ধান্ত’—যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল বিচারালয়ের অলিন্দে অলিন্দে।

​দেশের প্রতিটি নাগরিক এখন সেই দিনের প্রতীক্ষায়, যখন আদালতের প্রতিটি রায় শুধু আইন নয়, বরং নিখাদ ন্যায়বিচারের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement