শাপলা চত্বরের কান্না এখনো থামেনি: পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস অন্তর্ভুক্তিসহ হেফাজতের ৫ দফা

 প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

শাপলা চত্বরের কান্না এখনো থামেনি: পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস অন্তর্ভুক্তিসহ হেফাজতের ৫ দফা

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​রাজধানীর লালবাগের হাজি আবদুল আলীম ঈদগাহ মাঠ আজ যেন এক পশলা স্মৃতির মিছিলে রূপ নিয়েছিল। ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা মনে করে উপস্থিত আলেম-ওলামাদের চোখেমুখে ছিল বিষাদের ছাপ, আর কণ্ঠে ছিল বিচারের জোরালো দাবি। দীর্ঘ সময় নীরব থাকার পর আবারও সরব হয়ে উঠেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। লালবাগ জোনের উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাবেশে আলেমদের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে কেবল বিচার নয়, বরং সেই দিনের প্রকৃত ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার।

​বিকেলের তপ্ত রোদে লালবাগের আজাদ মাঠে জমায়েত হওয়া হাজারো মানুষের সামনে সংগঠনের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়েছে সুনির্দিষ্ট পাঁচ দফা দাবি। হেফাজত নেতারা বলছেন, শাপলা চত্বরে যা ঘটেছিল, তা কেবল একটি রাজনৈতিক সংঘাত ছিল না, বরং তা ছিল এক ‘গণহত্যা’। আর এই গণহত্যার সঠিক ইতিহাস জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিটিই এখন তাদের প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা চান, পাঠ্যবইয়ের পাতায় পাতায় লেখা থাকুক সেই রাতের সত্য ঘটনা, যাতে আগামী প্রজন্ম জানতে পারে তাদের উত্তরসূরিদের ত্যাগের কথা।

​সমাবেশের পরিবেশ আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে যখন বক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। নিছক বিচারের দাবিতেই তারা ক্ষান্ত নন; নিহতদের পরিবারের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের পূর্ণ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দাবি জানানো হয়েছে রাষ্ট্রের কাছে। আলেমদের অভিযোগ, গত এক দশকে অসংখ্য মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় জর্জরিত করা হয়েছে ধর্মপ্রাণ মানুষদের। সেসব মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, হেফাজত ঘোষিত মূল ১৩ দফা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন থামবে না।

​হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল হামিদ (পীর সাহেব মধুপুর) তার বক্তব্যে আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক এক কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বর্তমান সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ইমামত’ বা নেতৃত্ব আলেমদের হাতে ছিল এবং তা আবারও ফিরে আসবে। যারা বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনায় আছেন, তাদের কল্যাণ ধর্মপ্রাণ মানুষের সঙ্গে থাকার মধ্যেই নিহিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। অতীতের দমন-পীড়নের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, আলেমদের অবজ্ঞা করলে তার পরিণতি শুভ হবে না।

​অন্যদিকে, যুগ্ম মহাসচিব সাখাওয়াত হোসাইন রাজির কণ্ঠে ছিল সতর্কবার্তা। তিনি মনে করিয়ে দেন, বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে আলেম-ওলামা ও তৌহিদি জনতার বিশাল ত্যাগ রয়েছে। কিন্তু সরকারের অভ্যন্তরে এখনো ‘ফ্যাসিবাদ ও নাস্তিক্যবাদের দোসররা’ ঘাপটি মেরে আছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে, এসব ষড়যন্ত্রকারীদের সময়মতো চিহ্নিত করে সরানো না হলে রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যার দায়ভার সরকারকেও নিতে হবে।

​মুফতি জুবায়ের আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশ থেকে একটি বার্তা স্পষ্ট—হেফাজতে ইসলাম রাজপথে সাময়িকভাবে নীরব থাকলেও তাদের লক্ষ্য ও দাবিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। শাপলা চত্বরের সেই রক্তঝরা ইতিহাসকে জাতীয় স্বীকৃতির মর্যাদায় আসীন করতে এবং নিজেদের হারানো অধিকার আদায়ে তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার। লালবাগের এই মাঠ থেকে আজ যে প্রতিধ্বনি উঠল, তা আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক ও শিক্ষাব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

Advertisement
Advertisement
Advertisement