সীমান্তে ঘরমুখো মানুষের ঢল: পশ্চিমবঙ্গে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ চালুর ঘোষণায় আতঙ্ক
অনলাইন ডেস্ক: ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তৎপরতা এবং ‘হোল্ডিং সেন্টার’ চালুর ঘোষণার পর বাংলাদেশ সীমান্তে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আটক হওয়া ও বন্দিশালায় যাওয়ার আতঙ্ক থেকে বাঁচতে সীমান্ত এলাকায় ভিড় বাড়াচ্ছেন শত শত মানুষ। বিশেষ করে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেরার জন্য নারী ও শিশুসহ বহু মানুষের অপেক্ষার দৃশ্য এখন রাজ্যজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। দীর্ঘদিনের চেনা পরিবেশ ছেড়ে হঠাৎ এক কাপড়ে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া এই মানুষদের চোখে-মুখে এখন শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই স্বরূপনগরের হাকিমপুর চেকপয়েন্টে এক ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। সেখানে জড়ো হওয়া মানুষের সংখ্যা সাধারণ দিনের তুলনায় অনেক বেশি। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ আর কোলের শিশুকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ক্লান্ত ও আতঙ্কিত মুখগুলোই বলে দিচ্ছিল ভেতরের অস্থিরতা। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, এই মানুষগুলোর একটি বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস ও শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। হঠাৎ করে রাজ্য সরকারের কঠোর অবস্থানের ঘোষণায় তারা নিজেদের আর নিরাপদ মনে করছেন না।
এর আগে গত রোববার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, রাজ্যে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিকদের শনাক্ত করতে বিভিন্ন জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা অস্থায়ী আটক কেন্দ্র চালু করা হবে। ঘোষণার পরদিনই, অর্থাৎ সোমবার থেকেই এই কেন্দ্রগুলোর প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করার খবর চাউর হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যারা অতীতে দালালের হাত ধরে কিংবা সীমান্ত নজরদারির ফাঁক গলে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের মধ্যেই এই ভীতি সবচেয়ে বেশি কাজ করছে। অনেকেই আইনি জটিলতা এড়াতে নিজেদের উদ্যোগে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে এই পরিস্থিতি অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগেও যখন ভারতে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে আলোচনা ও তোড়জোড় শুরু হয়েছিল, তখনও একই ধরনের সীমান্তমুখী ঢল দেখা গিয়েছিল। সে সময়ও বহু মানুষ সব ফেলে বাংলাদেশে ফেরার পথ ধরেছিলেন। তবে এবারের ‘হোল্ডিং সেন্টার’ চালুর বিষয়টি অত্যন্ত দ্রুত ও সরাসরি বাস্তবায়িত হওয়ায় ভীতিটা বহুগুণ বেশি। স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, আটক হওয়ার চেয়ে নিজেরা দেশে ফিরে যাওয়াকেই অনেকে শ্রেয় মনে করছেন।
এদিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ আইনানুগভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সহায়তায় তাদের পুশব্যাক বা বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। তবে এই সাঁড়াশি অভিযানের কারণে সীমান্তে মানব পাচারকারী ও দালাল চক্রগুলোও আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সীমান্তেও নজরদারি ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, যাতে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা বা অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা না ঘটে। সব মিলিয়ে সীমান্তজুড়ে এখন এক থমথমে এবং মানবিক সংকটের আবহ বিরাজ করছে।