লাব্বাইকে মুখর আরাফাত: লাখো কণ্ঠের একই ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে বারবার

 প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ০৯:২৫ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

লাব্বাইকে মুখর আরাফাত: লাখো কণ্ঠের একই ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে বারবার

অনলাইন ডেস্ক:

​ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে পারেনি মক্কার মরু দিগন্ত। লোহিত সাগরের দিক থেকে আসা ভোরের মৃদু ও শীতল বাতাস মক্কার পাহাড়গুলোতে তখনো ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই মিনার উপত্যকা থেকে ধীরে ধীরে ভেসে আসতে শুরু করে এক পরম আবেগময় ও হৃদয়স্পর্শী ধ্বনি— ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক...’। সাদা ইহরামে মোড়া লাখো মানুষের কণ্ঠের এই আকুল আহ্বান মরুভূমির নিস্তব্ধতা ভেঙে এক অপার্থিব পরিবেশের সৃষ্টি করে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত, নানা বর্ণ আর নানা ভাষার মানুষের হৃদয় যেন আজ এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। সবার লক্ষ্য একটাই— মহান আল্লাহর দরবারে নিজেকে সঁপে দেওয়া। বিশ্ব মুসলিমের এই ঐতিহাসিক মহামিলনমেলা আজ মুখরিত করে তুলেছে পবিত্র আরাফাতের ময়দানকে, যা রূপ নিয়েছে আত্মসমর্পণ, ক্ষমাপ্রার্থনা আর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসার এক অনন্য মহাসমুদ্রে।

​সৌদি আরবের স্থানীয় সময় আজ মঙ্গলবার, পবিত্র জিলহজ মাসের ৯ তারিখ। মুসলিম উম্মাহর জন্য বছরের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও পবিত্র হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন আজ। মূলত গতকাল সোমবার থেকেই শুরু হয়েছে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা। আল্লাহর প্রিয় মেহমানরা মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে বিদায় নিয়ে ধীরে ধীরে সমবেত হতে শুরু করেন মিনার ঐতিহাসিক তাঁবুনগরীতে। ইসলামের বিধান অনুযায়ী ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’ বা তারবিয়ার দিন পালনের মধ্য দিয়ে হাজিরা সেখানে ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আসকার আর রোনাজারির মধ্য দিয়ে কাটান এক পুণ্যময় রাত। মিনার এই বিশাল সাদা তাঁবুর শহর যেন গোটা বিশ্বের এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়েছিল, যেখানে ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সবার পরিচয় মুছে গিয়ে কেবল ‘বান্দা’ হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে।

​সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গতকাল সোমবার থেকেই হজের প্রথম পর্ব অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে শুরু হয়েছে। হাজিদের মক্কা থেকে মিনায় স্থানান্তরের জন্য পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সব ধরনের লজিস্টিক ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, হজের মূল পর্বের সূচনা করতে যাত্রীরা মক্কার নিজ নিজ বাসস্থান ও হোটেল থেকে ইহরাম পরিধান করে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে মিনায় পৌঁছান। হাজিদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে মক্কা ও মিনার মধ্যবর্তী সড়কগুলোতে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করা হয়, যার ফলে তীব্র গরমের মধ্যেও কোনো ধরনের বড় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই লাখ লাখ হাজি মিনায় সমবেত হতে পেরেছেন।

​মিনায় রাতভর ইবাদত শেষে আজ ফজরের নামাজ আদায় করেই সূর্য ওঠার আগে থেকে লাখো হাজি পায়ে হেঁটে, বাসে কিংবা বিশেষ ট্রেনে চড়ে রওনা হয়েছেন ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানের দিকে। চারদিকের পাহাড়ি উপত্যকা ও মহাসড়কগুলো তখন লাখ লাখ মানুষের শ্বেতশুভ্র উপস্থিতিতে এক জ্যান্ত নদীর মতো প্রবাহিত হতে থাকে। বাতাসে কেবলই প্রতিধ্বনিত হতে থাকে তাওহিদের মহাসঙ্গীত। এই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব কৃত্রিম সীমানা, জাতীয়তাবাদ, ভাষার প্রাচীর আর বর্ণের বৈষম্য যেন মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। এক বিশ্বাস, এক সত্তা আর এক মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে সবাই আজ এক কাতারে দাঁড়িয়েছেন।

​মক্কা নগরী থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই আরাফাত প্রান্তর ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ এক স্থান। এই সেই ঐতিহাসিক ময়দান, যেখানে আজ থেকে চৌদ্দশত বছরেরও বেশি সময় আগে দাঁড়িয়ে মানবতার মুক্তির দূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনের শেষ হজ বা বিদায় হজের অবিস্মরণীয় ভাষণ দিয়েছিলেন। মানুষের অধিকার, নারী অধিকার এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার সেই চিরন্তন বাণী আজও এই প্রান্তরে অনুরণিত হয়। এই ময়দানের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়, যেখানে আদি পিতা হজরত আদম (আ.) ও আদি মাতা বিবি হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলন ঘটেছিল এবং আল্লাহর দরবারে তাঁদের তাওবা কবুল হয়েছিল। হজের তিনটি প্রধান ফরজের মধ্যে অন্যতম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ হলো এই আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ৯ তারিখ দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই ময়দানে অবস্থান করা বাধ্যতামূলক। এ কারণেই স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন, ‘আরাফাতে অবস্থানই হলো প্রকৃত হজ।’ অর্থাৎ কেউ যদি হজের অন্য সব নিয়ম পালন করে কিন্তু কোনো কারণে এই নির্দিষ্ট সময়ে আরাফাতে উপস্থিত হতে না পারেন, তবে তাঁর হজ সম্পূর্ণ হবে না।

​আজ সারা দিন সূর্যোদয় থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাজিরা এই পবিত্র প্রান্তরে অবস্থান করবেন। তীব্র গরম ও আবহাওয়ার প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে লাখ লাখ মানুষ আজ আল্লাহর দরবারে হাত তুলে কাঁদছেন। কেউ জাবালে রহমতের পাদদেশে, কেউ বা নিজের তাঁবুর ভেতর কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, তাসবিহ ও বিশেষ দোয়ায় মশগুল রয়েছেন। দয়াময় আল্লাহর অশেষ রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের আশায় লাখো মানুষের চোখ বেয়ে ঝরছে অনুশোচনার অশ্রু। দুপুরে মসজিদে নামিরাহ থেকে দেওয়া হজের খুতবা শোনার পর হাজিরা একই সঙ্গে একই আজানে ও পৃথক ইকামতে জোহর এবং আসরের নামাজ কসর ও জমা করে আদায় করবেন। সারা বিশ্বের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য কামনায় আজ লাখো হাত উম্মুক্ত থাকবে আকাশের পানে।

​এ বছর আরাফাতের ময়দানে বিশ্ব মুসলিমের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক হজের খুতবা দেওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছেন মসজিদে নববির প্রধান ইমাম ও প্রখ্যাত খতিব শায়েখ আলি বিন আবদুল রহমান আল-হুদাইফি। তাঁর প্রাজ্ঞ ও হৃদয়গ্রাহী খুতবা শোনার জন্য এবং ইসলামের শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা হৃদয়ে ধারণ করতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কোটি কোটি মুসলমান রেডিও, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সামনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। এই খুতবাটি বিশ্বের প্রধান প্রধান বেশ কয়েকটি ভাষায় তাৎক্ষণিক অনুবাদেরও ব্যবস্থা করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

​আরাফাতের ময়দানে দিনভর অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা শেষে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়বে, তখন হাজিরা সূর্যাস্তের পর মাগরিবের নামাজ না পড়েই রওনা হবেন মুজদালিফার উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছে তাঁরা মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন এবং খোলা আকাশের নিচে, পাহাড়ের কোলে বালুর শয্যায় রাত কাটাবেন। এই মুজদালিফার প্রান্তর থেকেই হাজিরা পরবর্তী দিনের আনুষ্ঠানিকতার জন্য ছোট ছোট পাথর সংগ্রহ করবেন। এরপর ১০ জিলহজ বুধবার সকালে ফজরের নামাজ পড়ে হাজিরা পুনরায় মিনায় ফিরে আসবেন। মিনায় ফেরার পর শয়তানের উদ্দেশ্যে বড় জামরায় পাথর নিক্ষেপ, আল্লাহর নামে পশু কোরবানি এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করার মাধ্যমে হজের মূল ইহরাম ভঙ্গ করবেন এবং পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফের মাধ্যমে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটাবেন।

​সৌদি আরবের পরিসংখ্যান ব্যুরো ও হজ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশ থেকে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান এই পবিত্র ফরজ ইবাদত পালন করছেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আল্লাহর মেহমানদের এই ঢল প্রমাণ করে ইসলামের প্রতি মানুষের গভীর অনুরাগ। বাংলাদেশ থেকেও এ বছর সব বাধা বিপত্তি পেরিয়ে প্রায় সাড়ে ৭৮ হাজার হজযাত্রী পবিত্র হজে অংশ নিয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আসা এই সব হাজিদের চোখেমুখে এখন ক্লান্তি নয়, বরং এক পরম তৃপ্তি ও ব্যাকুলতা। তাঁদের প্রত্যেকের হৃদয়ে আজ একটাই মাত্র তীব্র আকঙ্ক্ষা— মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য অর্জন এবং জীবনের সমস্ত বিগত গুনাহ খাতা থেকে চিরতরে মুক্তি লাভ করে নিষ্পাপ হয়ে ঘরে ফেরা।

​বিশাল এই জনসমুদ্রের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব প্রশাসন এবার নজিরবিহীন ও আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। প্রচণ্ড গরমের হাত থেকে হাজিদের রক্ষা করতে পবিত্র স্থানগুলোতে স্বয়ংক্রিয় ঠান্ডা পানির স্প্রে এবং বিশেষ এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। হাজার হাজার নিরাপত্তা কর্মী, চিকিৎসক, নার্স এবং স্বেচ্ছাসেবী দিনরাত এক করে আল্লাহর মেহমানদের সেবায় নিয়োজিত আছেন। সৌদি আরবের সরকারি সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, বিশেষ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল মনসুর বিন নাসের আল-ফায়েজ নিজে পবিত্র স্থানগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন শেষে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, হাজিদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিতে এবং তাঁদের ইবাদত যেন সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন হয়, তা নিশ্চিত করতে সব বাহিনী আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে কাজ করছে। ড্রোনের মাধ্যমে জননিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থার মধ্যে চমৎকার ও নিবিড় সমন্বয় থাকার কারণে এবারের হজ বিগত বছরগুলোর চেয়েও অনেক বেশি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement