আফগান নারীদের ভাগ্যে নতুন বিপর্যয়: আইনের আড়ালে বাল্যবিবাহের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ

 প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৮:২২ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

আফগান নারীদের ভাগ্যে নতুন বিপর্যয়: আইনের আড়ালে বাল্যবিবাহের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ

​আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে তালেবান শাসনে নারীদের অধিকারের পরিধি ক্রমাগত সংকুচিত হতে হতে এবার এক চরম বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। একের পর এক কঠোর ডিক্রি জারির পর এবার দেশটির বর্তমান সরকার নতুন একটি আইনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাল্যবিবাহকে কার্যত আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে বলে তীব্র অভিযোগ তুলেছেন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা। নতুন এই আইনি কাঠামোর ফলে একদিকে যেমন নাবালিকা মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে কোনো বাধা থাকছে না, অন্যদিকে স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো মেয়েশিশু বা তরুণীর বিবাহবিচ্ছেদ চাওয়ার পথও প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অধিকারকর্মীরা এই পদক্ষেপকে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা’ ও একটি ‘লজ্জাজনক’ অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

​তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আফগানিস্তানে জোরপূর্বক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের কোনো সরকারি পরিসংখ্যান মেলেনি। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণির পর অর্থাৎ ১১ বছর বয়সের পর মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। একটি অনানুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বন্ধ হওয়ার পর থেকে দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ মেয়েকে অল্প বয়সে বা জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৬৬ শতাংশেরই বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিবারগুলো মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভোগে এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়েই নাবালিকা কন্যাদের বিয়ে দিয়ে দেয়।

​গত সপ্তাহে অনুমোদিত নতুন বিবাহবিচ্ছেদ আইনটি আফগান নারীদের আইনি সুরক্ষাকে একবারে তলানিতে নিয়ে ঠেকিয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, কোনো মেয়ে যদি পরবর্তীতে দাবিও করে যে তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার স্বামী যদি সেই দাবিতে আপত্তি জানায়, তবে ওই নারী কোনোভাবেই বিচ্ছেদ চাইতে পারবে না। আইনটিতে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, স্বামীর দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি কিংবা স্ত্রীকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা বা ভরণপোষণ না দেওয়াকে একমাত্র কারণ দেখিয়ে কোনো নারী আদালতে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবেন না। এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার ফলে নারীরা কার্যত তাদের স্বামীদের অধীনস্থ এক বন্দি জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন, যেখানে আইনি উপায়ে মুক্তির সব পথ রুদ্ধ।

​এই নিষ্ঠুর ও বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলতে শুরু করেছে। চলতি সপ্তাহে কড়া নিরাপত্তা ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজধানী কাবুলের রাস্তায় নেমে নতুন এই আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন বেশ কিছু সাহসী নারী। বিভিন্ন নারী অধিকার সংগঠন এই আইনটিকে আফগান সমাজের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার এবং নারীদের অধস্তন অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার একটি চূড়ান্ত নীলনকশা হিসেবে বর্ণনা করেছে। ফাতিমা নামের একজন স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, নারীবিরোধী শত শত নির্দেশ জারির পর এখন তালেবান আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর মধ্যেই বাল্যবিবাহকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছে। নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বদলে তারা লজ্জাজনক নারীবিদ্বেষী নির্দেশ জারি ও মানুষের স্বাধীনতা দমনে ব্যস্ত রয়েছে।

​আন্তর্জাতিক মহলেও এই আইন নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। আফগানিস্তানে নিয়োজিত জাতিসংঘ সহায়তা মিশন (ইউএনএএমএ) এই ডিক্রির তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ সংক্রান্ত নীতিমালা নির্ধারণকারী এই নতুন আইন আফগান নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকারকে আরও ক্ষয় করার আরেকটি ধাপ এবং এটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করবে। ইউএনএএমএর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জর্জেট গ্যাগনন এক বিবৃতিতে জানান, এই আইনটি এমন এক উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতার অংশ, যেখানে আফগান নারী ও মেয়েদের মৌলিক অধিকার ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে এবং এটি এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করছে যেখানে নারীরা স্বাধীনতা, সুযোগ ও ন্যায়বিচারের অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।

​তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়েছে তালেবান প্রশাসন। সরকারের এক মুখপাত্র এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ন্যাশনাল রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশনকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা ইসলাম ধর্ম ও ইসলামী ব্যবস্থার বিরোধী, তাদের প্রতিবাদে কান দেওয়ার কোনো প্রয়োজন সরকারের নেই। সরকারের এই অনমনীয় মনোভাবের কারণে দেশটির সাধারণ নারী ও শিশুদের জীবন আরও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

​বাস্তব ক্ষেত্রে এই আইনের প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা উঠে এসেছে আফগানিস্তান হিউম্যান রাইটস সেন্টারের সাম্প্রতিক গবেষণায়। তাদের তথ্যানুযায়ী, দেশটিতে বাল্যবিবাহের অধিকাংশ ভুক্তভোগী মেয়েই চরম গৃহস্থালি সহিংসতা ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার শিকার হচ্ছে। এর একটি করুণ উদাহরণ তৈরি হয়েছে চলতি মাসের শুরুতে মধ্য আফগানিস্তানের দায়কুন্দি প্রদেশে, যেখানে মাত্র ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী স্বামীর নির্মম নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছে। নিহতের বাবার দেওয়া তথ্যমতে, মাত্র আট মাস আগে মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল তার চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে, যার মাত্র দুই মাস পর থেকেই তার ওপর অমানবিক নির্যাতন শুরু হয়। প্রতিবার মারধরের পর স্থানীয় প্রবীণরা ঐতিহ্যগত সালিশের মাধ্যমে তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আবার সেই নরকতুল্য সংসারে ফিরে যেতে বাধ্য করতেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি হয়েছে মেয়েটির মৃত্যুতে। নতুন এই আইন পাসের পর এ ধরনের ঘটনার বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা চিরতরে হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

​আফগানিস্তান ইন্ডিডিপেনডেন্ট হিউম্যান রাইটস কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা আবদুল আহাদ ফারজাম সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন যে, তালেবানের নতুন আইন ও তাদের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বাল্যবিবাহকে একপ্রকার আইনি বৈধতা দিচ্ছে। এর মাধ্যমে বিয়েতে নারীর স্বাধীন সম্মতির সর্বজনীন নীতিকে চরমভাবে সীমিত করা হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নারীদের সেই অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই আইন দীর্ঘ মেয়াদে আফগান নারীদের আইনি দৃষ্টিতে অসম ও সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন এক অন্ধকার যুগে নিয়ে যাবে, যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে অসম্ভব বললেই চলে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement