সম্প্রীতির বার্তা: আসামে ঈদে গরু কোরবানি থেকে বিরত থাকার আহ্বান ঈদ কমিটির
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতের আসাম রাজ্যে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনে এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী ছবি ফুটে উঠেছে। ঐতিহ্যগতভাবে উৎসবের আমেজে কোরবানি দেওয়া হলেও, এবার রাজ্যের সামগ্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে বেশ কিছু অঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব পালনের স্বার্থে আসামের একাধিক শীর্ষস্থানীয় ঈদ কমিটি এবার ঈদুল আজহায় গরু কোরবানি থেকে বিরত থাকার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে, যা দেশটির জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতেও বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার পাচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার একটি বিশেষ আহ্বান। মুখ্যমন্ত্রীর সেই আহ্বানের পর ধুবড়ি ও হোজাইসহ আসামের বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান এলাকার ঈদগাহ ও কবরস্থান কমিটিগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৈঠক ডেকে এই ধরনের স্পর্শকাতর অথচ দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। মূলত আসামের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং আইনি কড়াকড়িকে মাথায় রেখেই স্থানীয় সুশীল সমাজ ও ধর্মীয় নেতারা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।
ধুবড়ি টাউন ঈদগাহ কমিটি তাদের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, এবারের ঈদুল আজহা যেন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত উপায়ে পালিত হয়, সেটি নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। আসাম সরকারের কার্যকর করা 'গবাদিপশু সংরক্ষণ আইন' অনুযায়ী রাজ্যে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে গরু জবাইয়ের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে আইনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে উৎসবের দিনগুলোতে পরিবেশগত বিপর্যয় এড়াতে এবং সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে নির্ধারিত স্থানে কোরবানি দেওয়া, দ্রুত বর্জ্য অপসারণ করে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সামাজিক শালীনতা রক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কমিটির পক্ষ থেকে একটি বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে। ডিজিটাল যুগে যেকোনো স্পর্শকাতর ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করতে পারে, সেই আশঙ্কা থেকে কোরবানির কোনো ছবি বা ভিডিও ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্য কোনো সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ না করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কমিটির কর্তাব্যক্তিদের মতে, এমন কোনো দৃশ্য যেন জনসমক্ষে না আসে যা অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বা সামাজিক অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এবং দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে পারে।
ধুবড়ি ঈদগাহ কমিটির সভাপতি এই সিদ্ধান্তের পেছনের ধর্মীয় ও সামাজিক দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ইসলাম ধর্মে কোরবানি একটি অত্যন্ত পবিত্র ইবাদত হলেও নির্দিষ্ট কোনো একটি পশুই কোরবানি দিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই। বরং ইসলামের মূল শিক্ষাই হলো ত্যাগ, সহমর্মিতা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো। বহুত্ববাদী সমাজে শান্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখতে যদি কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তবে তা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ। তাই বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভেবেই তারা এই সাহসী ও ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
ধুবড়ির মতো একই সুর শোনা গেছে হোজাই টাউন ঈদগাহ কবরস্থান কমিটির কণ্ঠেও। তারাও স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্দেশে একই ধরনের নির্দেশনা জারি করে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা দিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। তিনি বলেন, ঈদগাহ কমিটিগুলোর এই সিদ্ধান্ত দেশের আইন মানা এবং ভিন্ন ধর্মমতের প্রতি পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনের একটি চমৎকার ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। তিনি রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের ঈদ কমিটিকেও এই ধরনের দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেন। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আসামে সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তন, নতুন আইন ও সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঈদ উদযাপনকে ঘিরে মুসলিম সম্প্রদায়ের এই অতিরিক্ত সতর্কতা ও স্ব-নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশনা মূলত সমাজে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি বজায় রাখতে একটি কৌশলগত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে।