রাবাতে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত: মানবতার প্রতি আমাদের গভীর নৈতিক দায়বদ্ধতা

 প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

রাবাতে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত: মানবতার প্রতি আমাদের গভীর নৈতিক দায়বদ্ধতা

অনলাইন ডেস্ক:

​মরক্কোর ঐতিহাসিক ও রাজকীয় রাজধানী রাবাতে বৈশ্বিক শান্তিরক্ষার এক অনন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানের কথা আবারও স্মরণ করিয়ে দিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। ফ্রাঙ্কোফোন পরিবেশে শান্তিরক্ষা বিষয়ক দ্বিতীয় মন্ত্রী পর্যায়ের উচ্চপর্যায়ের এই সম্মেলনে তিনি যখন বাংলাদেশের হয়ে বক্তব্য রাখছিলেন, তখন হলরুমে উপস্থিত বিশ্বনেতারা শুনছিলেন বহুপাক্ষিকতা ও বিশ্ব শান্তির প্রতি একটি দেশের অটল প্রতিশ্রুতির গল্প। মরক্কো ও ফ্রান্স সরকারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনে বাংলাদেশ কেবল একটি অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে নয়, বরং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে তার গৌরবময় অবস্থান তুলে ধরে।

​পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া কেবল একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব বা আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি মূলত মানবতার প্রতি এক গভীর নৈতিক দায়বদ্ধতা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, বাংলাদেশ সবসময়ই বিশ্ব পরিমণ্ডলে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই শান্তি দর্শনের শিকড় অনেক গভীরে পোতা। তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কথা, যিনি বাংলাদেশের শান্তিকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সেই নীতি আরও শক্তিশালী ও বেগবান হয়। এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বমঞ্চে শান্তির এক নির্ভরযোগ্য অগ্রদূত।

​বক্তব্যের এক আবেগঘন মুহূর্তে প্রতিমন্ত্রী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে জীবন উৎসর্গকারী ১৭৪ জন বীর বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তাদের এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা যেভাবে সংঘাতবিক্ষুব্ধ অঞ্চলে কাজ করে যাচ্ছেন, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে তিনি বর্তমান শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের ক্রমবর্ধমান এবং অত্যন্ত কার্যকর অংশগ্রহণের ভূয়সী প্রশংসা করেন। নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা (WPS) এজেন্ডাকে বাংলাদেশের শান্তি প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা সংস্কার এবং নারীর ক্ষমতায়নে দেশের অভ্যন্তরীণ চলমান উদ্যোগগুলোই মূলত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

​তবে কেবল অতীতের গৌরবগাথা নয়, আধুনিক যুগে শান্তিরক্ষা মিশনের সামনে আসা নতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জগুলোর দিকেও বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। বর্তমানের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ভুল তথ্য প্রচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি এবং শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে সাইবার হামলাকে তিনি অন্যতম প্রধান সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে প্রযুক্তির নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর তিনি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মিশনগুলোকে সফল করতে হলে বাস্তবসম্মত ও সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ, সৈন্য ও পুলিশ প্রেরণকারী দেশগুলোর সঙ্গে জাতিসংঘের উন্নততর পরামর্শ ব্যবস্থা এবং শান্তিরক্ষীদের মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ যে এ বিষয়ে কতটা আন্তরিক, তা প্রমাণ করতে তিনি ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং’ (বিপসট)-এর মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাক-মোতায়েন প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপশি, জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে পরিবেশবান্ধব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।

​২০১৬ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্রথম সম্মেলনের সফলতার পর রাবাতের এই দ্বিতীয় আয়োজনটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মরক্কোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাদিয়া ফাইজুন্নেসা। সম্মেলনের মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষে কূটনৈতিক তৎপরতার ধারাবাহিকতায় একই দিন সন্ধ্যায় রাবাতের অভিজাত ফোর সিজনস হোটেলে আয়োজিত ‘গ্লোবাল গ্রোথ কনফারেন্স ২০২৬’-এ অংশ নেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। সেখানে ‘ভূরাজনৈতিক বিভাজনের রাজনীতি: ক্ষমতা, উত্তেজনা ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ সেশনে তিনি মূল বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন। বর্তমান পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, পরাশক্তিগুলোর শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিভাজনের মাঝে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের স্বার্থ রক্ষা করে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখছে, তা তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তুলে ধরেন। রাবাতের এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসরে বাংলাদেশের এমন জোরালো উপস্থিতি ও দূরদর্শী বক্তব্য বিশ্বমঞ্চে দেশের কূটনৈতিক ও শান্তিরক্ষা নেতৃত্বের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করল।

Advertisement
Advertisement
Advertisement