হজ মৌসুমে সংঘাতের ঝুঁকি: মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের অনুরোধ ও বিশ্ব রাজনীতির নেপথ্য সমীকরণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং যুদ্ধকৌশলের চিরচেনা হিসাব-নিকাশকে পেছনে ফেলে এবার ধর্মের এক মহাসম্মেলন বড় ভূমিকা রাখল যুদ্ধ বিরতির নেপথ্যে। আসন্ন পবিত্র হজ মৌসুমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি সম্ভাব্য বড় ধরনের যুদ্ধ এড়াতে ইরানে পরিকল্পিত সামরিক হামলা স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মূলত পবিত্র হজের সময়ে যুদ্ধ শুরু হলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে যে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতো এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যে মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট দেখা দিত, সেই আশঙ্কার কারণেই ওয়াশিংটন আপাতত তাদের রণকৌশল থেকে পিছিয়ে এসেছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রতিবেদনে উপসাগরীয় অঞ্চলের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, মে মাসের শেষ সপ্তাহে শুরু হতে যাওয়া হজের সময় যদি ইরানে হামলা চালানো হতো, তবে তা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ধ্বংস করে দিত। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মুসল্লি সৌদি আরবে এসে পৌঁছেছেন। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ শুরু হলে সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের প্রধান কেন্দ্রগুলো অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকত। লাখ লাখ বিদেশি নাগরিক ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলোতে আটকে পড়ার এক নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় তৈরি হতে পারত। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা ট্রাম্পকে সাফ জানিয়ে দেন যে, হজ ও ঈদুল আজহার ঠিক আগে এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেবে, যা পুনরুদ্ধার করা ট্রাম্পের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নেও এই যুদ্ধকে আত্মঘাতী হিসেবে দেখা হচ্ছিল। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই সময়ে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে তা খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টেরই ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুনামের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতো। তবে পর্দার পেছনের এই সিদ্ধান্ত কেবল মার্কিন প্রশাসনের নিজস্ব চিন্তার ফসল ছিল না। খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক বার্তায় স্বীকার করেছেন যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রভাবশালী রাষ্ট্রপ্রধানরা তাকে এই বিষয়ে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, তেহরানের সাথে চলমান সংকটের এখনো কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোলা রয়েছে, তাই হজের মতো পবিত্র সময়ে যুদ্ধের দামামা বাজানো কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে বিমান হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল যে, তাদের কোনো জ্বালানি বা বেসামরিক অবকাঠামোতে নতুন করে আঘাত করা হলে, তারা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে দেবে। ইরানকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য প্রধান হুমকি মনে করা ইসরাইল অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছিল যেন এই সামরিক অভিযান বন্ধ না করা হয়। কিন্তু মার্কিন পেন্টাগন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হাজার হাজার মার্কিন সেনার জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।
তাছাড়া, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সংকটের দিকে ইঙ্গিত করেছে। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে গোলাবারুদের ঘাটতিতে ভুগছে এবং একই সাথে ইরানের অত্যাধুনিক ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেদ করে নতুন কোনো সফল অভিযান চালানো এই মুহূর্তে মার্কিন বিমানবাহিনীর জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। ওয়াশিংটন ভেবেছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণের পর দেশটির সরকার ও সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়বে, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। তার উত্তরসূরি হিসেবে আলোচিত মোজতবা খামেনির অধীনে ইরান এখনো তাদের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক পুরোপুরি অক্ষুণ্ন রেখেছে।
তবে এই হামলা স্থগিতের অর্থ এই নয় যে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফিরে এসেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এটি আসলে মার্কিন প্রশাসনের একটি বিভ্রান্তিকর রণকৌশলও হতে পারে। হজ মৌসুম শেষ হওয়ার পরপরই, অর্থাৎ মুসল্লিরা নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পর, যেকোনো মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যাওয়া যুদ্ধ মেশিন আবার সচল হয়ে উঠতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে ধর্মের প্রতি সম্মান বা কৌশলগত বাধ্যবাধকতার কারণে ট্রাম্প পিছিয়ে গেলেও, হজের পরের দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আবার যুদ্ধের কালো মেঘে ঢেকে যাবে কিনা, সেই আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
সূত্র : মিডল ইস্ট আই