সৌদি আরবে সাঁড়াশি অভিযান: এক সপ্তাহে সাড়ে ৯ হাজার গ্রেপ্তার, ১১ হাজার প্রবাসী বহিষ্কৃত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সৌদি আরবজুড়ে অবৈধ অভিবাসী, শ্রম আইন লঙ্ঘনকারী এবং সীমান্ত সুরক্ষাবিধি অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনায় নিরাপত্তা বাহিনী ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থা যৌথভাবে দেশব্যাপী এই টহল ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করেছে। গত এক সপ্তাহে চালানো এই ব্যাপক ধরপাকড়ে প্রায় সাড়ে নয় হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং একই সময়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ১১ হাজারের বেশি প্রবাসী নাগরিককে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ রোববার সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে। আধুনিক সৌদি আরবের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় অবৈধ জনশক্তির বিরুদ্ধে রিয়াদের এই কঠোর অবস্থানকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় শুদ্ধি অভিযান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ থেকে ১৩ মের মধ্যবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ৯ হাজার ৫৭৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আটককৃতদের অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এদের মধ্যে বড় একটি অংশ অর্থাৎ ৪ হাজার ৮৬৫ জন দেশটির দীর্ঘদিনের প্রচলিত বাসস্থানসংক্রান্ত বা ‘ইকামা’র নিয়ম লঙ্ঘন করে বসবাস করছিলেন। এ ছাড়া ৩ হাজার ৩১৯ জনকে সরাসরি সীমান্ত নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের দায়ে এবং ১ হাজার ৩৯২ জনকে শ্রমসংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সৌদি আরবের শ্রমবাজারকে আরও সুশৃঙ্খল ও বৈধ কাঠামোর মধ্যে আনতেই মূলত এই সুনির্দিষ্ট খাতগুলোতে জোর দেওয়া হচ্ছে।
একই সময়ে দেশটির সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে আরও বড় ধরনের আটকের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন মানুষকে অবৈধ উপায়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সৌদি ভূখণ্ডে প্রবেশের সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই অনুপ্রবেশকারীদের একটি বিশাল অংশ প্রতিবেশী দেশ ইয়েমেনের নাগরিক। বাকিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইথিওপিয়ান এবং অন্যান্য বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন, যারা যুদ্ধবিদ্ধস্ত বা অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত অঞ্চল থেকে ভাগ্য অন্বেষণে অবৈধ পথ বেছে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, সৌদি আরবের ভেতরে আইনি জটিলতায় পড়ে বা কাজের সুযোগ হারিয়ে অবৈধভাবে দেশ ত্যাগের চেষ্টাকালে আরও ৫৮ জনকে সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ধড়পাকড়ের পাশাপাশি আটককৃতদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও সমান তালে এগিয়ে চলেছে। ইতিমধ্যেই সপ্তাহব্যাপী অভিযানের পর ১১ হাজার ২৭২ জন প্রবাসীকে আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরব থেকে বহিষ্কার বা ডিফোর্ট করা হয়েছে। তবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রশাসনের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে সাড়ে ১৩ হাজারের বেশি আটক ব্যক্তিকে তাদের প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি বা আউটপাস সংগ্রহের জন্য নিজ নিজ দেশের কূটনৈতিক মিশন ও দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে। একই সাথে বাকিদেরও দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বিমান টিকিট বুকিং ও প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। এই মুহূর্তের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৬ হাজারের বেশি প্রবাসী এখনো বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে রয়েছেন, যাদের ভাগ্য নির্ধারণে কাজ করছে দেশটির বিচার বিভাগ।
কেবলমাত্র অবৈধভাবে বসবাসকারী কর্মী বা অনুপ্রবেশকারীরাই নয়, এই চক্রের পেছনে থাকা মূল হোতা এবং সহযোগীদের ধরতেও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে রিয়াদ। অবৈধ অভিবাসীদের পরিবহন সুবিধা দেওয়া, আশ্রয় দেওয়া কিংবা কাজ দেওয়ার মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনে সরাসরি সহায়তা করার অভিযোগে ১২ জন মধ্যস্থতাকারী ও নিয়োগকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সৌদি প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে যে, অনুপ্রবেশকারী বা অবৈধ অবস্থানকারীদের যেকোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত বিপুল অঙ্কের জরিমানা হতে পারে। শুধু তাই নয়, এই ধরনের অবৈধ কার্যকলাপে বা মানবপাচারের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত যেকোনো যানবাহন, বাড়ি বা সম্পত্তিও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করা হবে। এই কড়া পদক্ষেপের মাধ্যমে সৌদি সরকার বিশ্ববাসীকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চায় যে, দেশের জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর সুরক্ষায় কোনো ধরনের আপস করা হবে না।