৪ খাতে বাংলাদেশ থেকে দ্বিগুণ কর্মী নিতে চায় কাতার: ৮ বিভাগে ভিসা সেন্টার চালুর আশ্বাস
অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক:
বাংলাদেশ থেকে ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, এসি টেকনিশিয়ান ও ওয়েল্ডিং—এই চারটি সুনির্দিষ্ট কারিগরি খাতে দক্ষ কর্মী নেওয়ার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে কাতার। দেশটির চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের পাঁচটি নির্দিষ্ট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে সরাসরি এসব কর্মী নিয়োগ করা হবে। একই সাথে চলতি বছরে কাতারগামী বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ করার ইঙ্গিত দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী এই দেশটি।
সোমবার (১৮ মে) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কনফারেন্স কক্ষে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত ও আগ্রহের কথা উঠে আসে। বাংলাদেশ-কাতার যৌথ কমিটির এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং কাতারের প্রতিনিধি দলের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির শ্রমমন্ত্রী ড. আলী বিন সাঈদ বিন সামিখ আল মাররি।
বৈঠকের শুরুতে কাতারের শ্রমমন্ত্রীকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়ে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বিগত কয়েক দশকে দুই ভ্রাতৃপ্রতীম দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের অভূতপূর্ব অগ্রগতির কথা স্মরণ করেন। কাতার প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান এবং তাদের সার্বিক কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাতার সরকার যে সমস্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে, তার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মন্ত্রী। একই সাথে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে কাতার সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে দেশটির আমির যে অনন্য মানবিকতার নজির স্থাপন করেছিলেন, সেজন্য বাংলাদেশ সরকার ও দেশের সর্বস্তরের জনগণের পক্ষ থেকে কাতারের আমিরের প্রতি আন্তরিক মোবারকবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
কাতারের শ্রমবাজারকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী জানান, বর্তমানে চার লাখেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে কাতারের বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় অবদান রেখে চলেছেন। গত ২০২৩ সালে এক লাখ সাত হাজার ৫৯৮ জন বাংলাদেশি কর্মী কাতারে কর্মসংস্থান লাভ করেছে উল্লেখ করে মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, চলতি বছর দোহা কর্তৃপক্ষ এই সংখ্যাকে দ্বিগুণ করে আরও বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশিকে কাজের সুযোগ করে দেবে।
আলোচনার এক পর্যায়ে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী কাতারগামী কর্মীদের একটি বড় সমস্যার কথা কাতারের শ্রমমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে ঢাকায় কাতারের মাত্র একটি ভিসা ও মেডিকেল সেন্টার চালু রয়েছে, যা বিপুল সংখ্যক কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রসেসিংয়ের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। এর ফলে কর্মীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি শ্লথ হয়ে পড়ে। এই ভোগান্তি দূর করে স্বল্প সময়ে ভিসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের আটটি বিভাগীয় শহরে কাতারের ভিসা ও মেডিকেল সেন্টার স্থাপনের জন্য তিনি কাতারের শ্রমমন্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানান। বাংলাদেশের এই যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতে কাতারের শ্রমমন্ত্রী ড. আলী বিন সামিখ আল মাররি আশ্বস্ত করে বলেন, ঢাকার বাইরে আঞ্চলিক পর্যায়ে ভিসা সেন্টারের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হবে এবং এটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে কাতারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরও যোগ করেন যে, বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের অধীন সারা দেশে ১১০টি টেকনিক্যাল Training সেন্টার (টিটিসি) সচল রয়েছে, যেখানে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের চাহিদা বিবেচনা করে ৫৫টি ভিন্ন ভিন্ন ট্রেডে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে কাতার চাইলে যেকোনো সময় সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও দক্ষ জনবল বাংলাদেশ থেকে নিতে পারবে।
বৈঠকে উপস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক কাতারের চলমান বিশাল উন্নয়নযজ্ঞে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে কেবল সাধারণ শ্রমিক নয়, বরং পর্যাপ্ত সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত ও পেশাদার জনবল নিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বাংলাদেশ থেকে দক্ষ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নার্স, কেয়ারগিভার এবং ধর্মীয় ক্ষেত্রে ইমাম, মোয়াজ্জিন, খতিব ও ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের জন্য সফররত শ্রমমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
বাংলাদেশের জনশক্তির ভূয়সী প্রশংসা করে কাতারের শ্রমমন্ত্রী ড. আলী বিন সামিখ আল মাররি জানান, তার দেশের সরকারি হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে কাতারে প্রায় চার লাখ ৭৩ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক সুনামের সাথে কাজ করছেন। এদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ কর্মী সরাসরি কাতারের বৃহৎ উন্নয়নমূলক মেগা প্রজেক্টগুলোতে যুক্ত আছেন এবং বাকিরা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত। তিনি বাংলাদেশের যুবকদের কর্মদক্ষতার ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে চার নির্দিষ্ট কারিগরি খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান। এছাড়া কাতারে ইতিমধ্যে কর্মরত প্রবাসী অদক্ষ কর্মীদের আরও দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে কাতার সরকারের পক্ষ থেকে দুটি বিশেষায়িত আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন, যা বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের মান ও বেতন বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত কাতারের রাষ্ট্রদূত সেয়ারা আলী মাহদি সাঈদ আল কাহতানি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খানসহ দু’দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে দুই দেশের শ্রমবাজার ও কূটনৈতিক সম্পর্কে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহল।