মায়ায় বড় হওয়া ‘কামিনী-মোস্তাক’: দুই হাজার ৫০০ কেজির চমক নিয়ে হাটের অপেক্ষায় হোসনা বেগম

 প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০৯:০১ অপরাহ্ন   |   ঢাকা

মায়ায় বড় হওয়া ‘কামিনী-মোস্তাক’: দুই হাজার ৫০০ কেজির চমক নিয়ে হাটের অপেক্ষায় হোসনা বেগম

​প্রতিবেদক, কিশোরগঞ্জ

​আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের পশুর হাটগুলো জমতে শুরু করেছে। কোরবানির বাজারে প্রতি বছরই নানামুখী নামের ও আকৃতির পশুর আগমন ঘটে, যা ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি করে। তবে এবার সব আলোচনা ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের উজানহাটি গ্রাম। সেখানে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে লালনপালন করা ‘কামিনী’ ও ‘মোস্তাক’ নামের দুটি বিশাল আকৃতির ষাঁড় এখন পুরো অঞ্চলের বিস্ময়। প্রায় ২ হাজার ৫০০ কেজি, অর্থাৎ প্রায় ৬২ মণ ওজনের এই দানবাকৃতির গরুর জুটিকে দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মানুষ খামারির বাড়িতে ভিড় করছেন। সাধারণ দর্শনার্থী থেকে শুরু করে পাইকার ও সৌখিন ক্রেতাদের আনাগোনায় নিভৃত এই গ্রামটি এখন উৎসবের আমেজে রূপ নিয়েছে।

​এই বিশাল সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক সংগ্রামের গল্প, যা ১৭ বছর আগে স্বামী হারানো হোসনা বেগম এবং তার ভাই সাইদুর রহমানের দীর্ঘ তিন বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম ও পরম মায়ার ফসল। বিধবা হওয়ার পর থেকে ভাইয়ের সংসারে আশ্রয় নিয়ে জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা হোসনা বেগম এই অবলা প্রাণী দুটিকে নিজের সন্তানের মতো করে যত্নে বড় করেছেন। গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগটি এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক সুযোগ, ধৈর্য এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রান্তিক নারীরাও ডেইরি খাতের উন্নয়ন ঘটিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন। হোসনা বেগমের এই মমত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাস আজ তাকে এলাকায় এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

​বর্তমান বাজারে অধিক লাভের আশায় কিছু অসাধু খামারি ও মৌসুমি ব্যবসায়ী কৃত্রিম উপায়ে, স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর ইনজেকশন দিয়ে দ্রুত পশু মোটাতাজাকরণের নেতিবাচক প্রবণতা বেছে নেন। এতে পশুর স্বাস্থ্য যেমন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তেমনি সেই মাংস মানবদেহের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। তবে খামারি সাইদুর রহমান ও হোসনা বেগম হেঁটেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ও সততার পথে। ক্ষতিকর রাসায়নিকের ছোঁয়া ছাড়াই তারা প্রমাণ করেছেন যে, সততা ও সঠিক পরিচর্যা দিয়েও বিশাল আকৃতির পশু উৎপাদন সম্ভব।

​খামারি সাইদুর রহমান জানান, তাদের ঘরের আলো করে থাকা ১৩০০ কেজি ওজনের ‘মোস্তাক’ এবং ১২০০ কেজি ওজনের ‘কামিনী’কে কোনো ধরনের রেডিমিক্স ফিড বা কৃত্রিম ওষুধ ছাড়াই বড় করা হয়েছে। প্রতিদিন ভোরে শুরু হয় এদের পরিচর্যা। সম্পূর্ণ দেশীয় উপায়ে উৎপাদিত কাঁচা ঘাস, খড়, ভুট্টা ভাঙা, গমের ভুসি, চালের কুঁড়া ও খাঁটি সরিষার খৈল খাইয়ে এদের স্বাস্থ্য ধরে রাখা হয়েছে। বর্তমানে এই বিশাল আকৃতির দুই ভাইয়ের পেছনে প্রতিদিনের খাদ্য বাবদ খরচ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা। বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা ও গো-খাদ্যের চড়া দামের বাজারে এই বিশাল ব্যয়ভার বহন করা তাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য ও চ্যালেঞ্জিং ছিল। এই অর্থনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও তারা আশা করছেন, কোরবানির হাটে সৌখিন ক্রেতাদের কাছে এই নিরাপদ, সুস্থ ও চঞ্চল পশুর সঠিক মূল্যায়ন হবে। তারা এই রাজকীয় জুটিটির দাম হাঁকছেন ২০ লাখ টাকা। এই অর্থ দিয়ে ভবিষ্যতে তারা আরও বড় পরিসরে একটি আধুনিক ও আদর্শ ডেইরি খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন, যাতে স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়।

​উজানহাটি গ্রামে সাইদুর রহমানের বাড়ির আঙিনা এখন আর শুধু একটি সাধারণ খামার বাড়ি নেই, এটি রূপ নিয়েছে দর্শনার্থীদের এক মুখরিত মিলনমেলায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সব বয়সী মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। স্থানীয় চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিউজফিড—সবখানেই এখন রাজত্ব করছে ‘কামিনী’ ও ‘মোস্তাক’। তরুণ দর্শনার্থীরা বিশালাকৃতির গরু দুটির সাথে ছবি ও সেলফি তুলছেন, ভিডিও তৈরি করে তা ফেসবুক, টিকটক এবং ইউটিউবে শেয়ার করছেন, যা মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশ-বিদেশে। দূর থেকে আসা দর্শনার্থীরা অবাক হয়ে জানান, সাধারণত এত বড় গরু অলস ও শান্ত প্রকৃতির হয়, কিন্তু সম্পূর্ণ ক্ষতিকর রাসায়নিক মুক্ত হওয়ায় এই গরু দুটি যেমন সুঠাম, তেমনি দারুণ চঞ্চল ও প্রাণবন্ত।

​নিকলী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান খামারিদের এই অভাবনীয় ও পরিবেশবান্ধব প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, হাওর অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত দেশীয় ঘাস ও খাদ্য সহজলভ্য হওয়ায় এখানকার পশুর মাংসের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ চমৎকার হয়। ‘কামিনী’ ও ‘মোস্তাক’কে যেভাবে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে লালনপালন করা হয়েছে, তা দেশের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশসম্মত পশুপালনের ক্ষেত্রে একটি আদর্শ উদাহরণ হতে পারে। সরকারের প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে খামারিদের এই ধরনের টেকসই ও নিরাপদ পশুপালনে উৎসাহিত করতে সব ধরনের প্রশাসনিক, কারিগরি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। ঢাকার মূল কোরবানির হাটে তোলার আগে খামারেই এই জুটির উপযুক্ত দাম মিলবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement