মধ্যরাতে মিরপুরে তাণ্ডব: শাহ আলী মাজারে হামলায় রক্ত ও অশ্রু

 প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ০৯:১৫ অপরাহ্ন   |   ঢাকা

মধ্যরাতে মিরপুরে তাণ্ডব: শাহ আলী মাজারে হামলায় রক্ত ও অশ্রু

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​রাজধানীর কয়েকশ বছরের প্রাচীন সুফি কেন্দ্রে মুখোশধারী হামলা; নেপথ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, অস্বীকার জামায়াতের

​মিরপুরের আকাশে তখন রাত একটার নিস্তব্ধতা। কয়েকশ বছর ধরে এই জনপদের আধ্যাত্মিক বাতিঘর হিসেবে পরিচিত হযরত শাহ আলী বোগদাদীর (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে চলছিল প্রথাগত বৃহস্পতিবারের রাতের জলসা। কেউ জিকিরে মগ্ন, কেউবা মানত নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পীরের ভক্ত। কিন্তু মুহূর্তেই সেই আধ্যাত্মিক প্রশান্তি চুরমার হয়ে গেল লাঠিসোঁটার শব্দ আর আর্তনাদে।

​যেভাবে শুরু হলো তাণ্ডব

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, রাত ১টার দিকে একদল যুবক মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক পরে হাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে মাজারের পূর্ব পাশে অতর্কিত হামলা চালায়। সেখানে মাদুর পেতে বসে থাকা নারী, পুরুষ ও হকারদের ওপর নির্বিচারে লাঠি চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পলিথিন ও মাদুর বিছিয়ে বসে থাকা সাধারণ মানুষকে মারধর করে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হচ্ছে। আতঙ্কে নারী ও শিশুরা এদিক-ওদিক ছুটতে থাকেন। ভক্তদের অভিযোগ, পবিত্র এই স্থানে তাদের ওপর যেভাবে হামলা চালানো হয়েছে, তা নজিরবিহীন।

​অভিযোগের আঙুল যেদিকে

মাজারের ভক্ত ও স্থানীয় বাসিন্দারা এই হামলার নেপথ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার দাবি করেছেন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও একই সুর পাওয়া গেছে।

​পুলিশের ভাষ্য: মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার মো. মোস্তাক সরকার সরাসরি জানিয়েছেন, জামায়াত-শিবিরের একটি অংশ এই হামলায় জড়িত ছিল।

​জামায়াতের অবস্থান: তবে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিন এই অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তাদের দলের কারো এই হামলার কোনো কারণ নেই।

​মাদক নাকি মাজার বিরোধিতা?

শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, হামলাকারীরা মাজার চত্বরে মাদক সেবনের অজুহাত তুললেও জুমার নামাজ যেখানে হয়, সেখানে মাদক সেবনের কোনো সত্যতা মেলেনি। বরং এটি সুফিবাদের ওপর পরিকল্পিত আঘাত কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

​একটি রক্তাক্ত আখ্যান: ইতিহাসের দায় ও বর্তমানের আতঙ্ক

​বাংলার সুফি ঐতিহ্য আজ এক কঠিন সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে সারা দেশে মাজার ও খানকাগুলোতে হামলার যে ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে, তার সর্বশেষ শিকার ঢাকার এই প্রাচীন মাজারটি।

​এক নজরে হামলার চালচিত্র:

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর তথ্যমতে, গত ১৭ মাসে সারাদেশে ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। শাহ আলী বোগদাদীর মাজারে হামলার ঘটনাটি যেন সেই দীর্ঘ তালিকার একটি রক্তক্ষয়ী পুনরাবৃত্তি।

​"আমরা এখানে জিকির করতে এসেছিলাম, কোনো রাজনীতি করতে নয়। আমাদের কেন মারা হলো?" — চোখে পানি নিয়ে প্রশ্নটি ছুড়ে দেন এক আহত ভক্ত।

​রাজনৈতিক সমীকরণ

২০২৪ সালের নির্বাচনের পর ঢাকা-১৪ আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। জামায়াতের প্রার্থী মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান) এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ এখন তুঙ্গে। এই হামলার পেছনে কোনো স্থানীয় প্রভাব বিস্তার নাকি আদর্শিক সংঘাত কাজ করছে, তা খতিয়ে দেখছে প্রশাসন।

​পরিশেষে, 

শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বা কেউ আটক হয়নি। শাহ আলীর মাজারের বর্তমান পরিবেশ এখন থমথমে। শতবর্ষের ঐতিহ্য আর মানুষের বিশ্বাসের কেন্দ্রগুলো কি এভাবেই রাজনৈতিক ও আদর্শিক বলির পাঠা হবে? এই প্রশ্ন এখন মিরপুর ছাপিয়ে পুরো দেশের বিবেককে তাড়িত করছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement