ছয় মাস পর পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলা: মিলল ৪৩ বস্তা টাকা, ছাড়াতে পারে সব রেকর্ড

 প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ১০:২৭ পূর্বাহ্ন   |   ঢাকা

ছয় মাস পর পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলা: মিলল ৪৩ বস্তা টাকা, ছাড়াতে পারে সব রেকর্ড

 নিজস্ব প্রতিবেদক, কিশোরগঞ্জ:

কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পাগলা মসজিদের ১৩টি দানবাক্স ছয় মাস পর খুলে পাওয়া গেছে ৪৩ বস্তা ভর্তি টাকা। শনিবার সকাল ৭টা থেকে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে দানবাক্স খোলার কার্যক্রম শুরু হয়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দীর্ঘ বিরতির পর দানবাক্স খোলায় এবার দানের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করতে পারে।

টাকা গণনার কাজে অংশ নিয়েছেন প্রায় পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি। এর মধ্যে রয়েছেন রূপালী ব্যাংকের প্রায় একশ কর্মকর্তা-কর্মচারী, আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়া ও পাগলা মসজিদ এতিমখানাসহ দুটি মাদরাসার প্রায় সাড়ে তিনশ শিক্ষার্থী, মসজিদ কমিটির সদস্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

মসজিদের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, মাদরাসার শিক্ষার্থীরা বস্তা থেকে টাকা বের করে আলাদা করে গোছাচ্ছেন। পরে সেগুলো বান্ডিল আকারে ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা বিশেষ মেশিনের সাহায্যে টাকা গণনা করছেন।

জেলা প্রশাসক ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান-এর তত্ত্বাবধানে পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদ এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান মারুফসহ জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা গণনার কাজ তদারকি করছেন।

রূপালী ব্যাংকের এজিএম মোহাম্মদ আলী হারিছি জানান, নগদ অর্থ ছাড়াও এবার দানবাক্সে পাওয়া গেছে বৈদেশিক মুদ্রা এবং সোনা-রূপার অলঙ্কার। সব অর্থ গণনা শেষ করতে সন্ধ্যা কিংবা রাত পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

দানবাক্স খোলা ও অর্থ গণনাকে কেন্দ্র করে মসজিদ এলাকায় জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ, র‌্যাব ও আনসার সদস্যরা পুরো কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান বলেন, দানবাক্স খোলা থেকে শুরু করে অর্থ গণনা এবং ব্যাংকে জমা দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। সারা বছরই দানসিন্দুকগুলোর নিরাপত্তা বজায় রাখা হয়।

কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত পাগলা মসজিদ দেশের অন্যতম আলোচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে দান করতে আসেন। নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণালংকার, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগিসহ নানা সামগ্রীও দান করা হয়। সোনা-রূপার অলঙ্কার ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী পৃথকভাবে সংরক্ষণ ও হিসাব করা হয়।

জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানান, মসজিদের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের পর অবশিষ্ট অর্থ ব্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে সরাসরি দানের শত কোটি টাকারও বেশি ব্যাংকে জমা রয়েছে। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে সংরক্ষিত আছে। পরবর্তীতে সেগুলো প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা হবে।

তিনি আরও জানান, পাগলা মসজিদের তহবিল থেকে জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানায় অনুদান প্রদান করা হয়। পাশাপাশি অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা সহায়তা এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও এ অর্থ ব্যয় করা হয়।

এদিকে, পাগলা মসজিদকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০ তলাবিশিষ্ট একটি আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে একসঙ্গে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে। নারী মুসল্লিদের জন্য পৃথক নামাজের স্থান, এতিমদের শিক্ষার ব্যবস্থা, মাদরাসা, লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া এবং আইটি সেকশনসহ বিভিন্ন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রাখা হবে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হবে এই বৃহৎ প্রকল্প।

উল্লেখ্য, সর্বশেষ গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর দানবাক্স খোলার সময় ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা পাওয়া যায়। এর আগে একই বছরের ৩০ আগস্ট দানবাক্স খুলে পাওয়া গিয়েছিল ১২ কোটি ৯ লাখ ৩৭ হাজার ২২০ টাকা। এবার ছয় মাস পর দানবাক্স খোলায় দানের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Advertisement
Advertisement
Advertisement