ভাতার ছায়ায় প্রতিবন্ধী মুক্তি, স্বাবলম্বী নারী: বেলাবোর মাঠে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নতুন দিগন্তের ঘোষণা

 প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১০:১৬ অপরাহ্ন   |   ঢাকা

ভাতার ছায়ায় প্রতিবন্ধী মুক্তি, স্বাবলম্বী নারী: বেলাবোর মাঠে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নতুন দিগন্তের ঘোষণা

​বিশেষ প্রতিবেদক, নরসিংদী:

তপ্ত বৈশাখের বিকেলে নরসিংদীর বেলাবো উপজেলা পরিষদ হলরুম তখন কানায় কানায় পূর্ণ। বাতাসে এক ধরণের উন্মুখ প্রতীক্ষা। গ্রামীণ নারীদের চোখে-মুখে এক অদ্ভুত কৌতূহল আর আশা। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মঞ্চে দাঁড়ালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বকুল। কোনো রাজনৈতিক গৎবাঁধা বুলি নয়, তিনি সরাসরি হাত রাখলেন মানুষের জীবনযুদ্ধের ক্ষতগুলোতে। এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়ে তিনি জানালেন, আগামী আট বছরের মধ্যে বাংলাদেশের বুকে কোনো একজন প্রতিবন্ধীও সরকারি ভাতার আওতাভুক্ত হওয়া থেকে বাদ থাকবে না।

​মন্ত্রী যখন জোর দিয়ে বলছিলেন, "যাদের পরিবারে প্রতিবন্ধী সন্তান বা সদস্য আছে, আপনারা নাম জমা দিন; আগামী জুলাই মাস থেকেই তাদের তালিকাভুক্ত করে ভাতার আওতায় আনা হবে"—তখন পুরো হলরুমে এক স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে। সমাজের অবহেলিত ও আড়ালে পড়ে থাকা এই মানুষগুলোর জন্য রাষ্ট্রের এই অঙ্গীকার যেন এক নতুন ভোরের বার্তা নিয়ে এলো।

​তবে বিকেলের আলো ঝলমলে সেই অনুষ্ঠানটি কেবল প্রতিবন্ধী ভাতার ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল মূলত সুবিধাবঞ্চিত নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তির এক উৎসব। দ্বিতীয় পর্যায়ের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মঞ্চ থেকে তুলে ধরেন এক ভিন্নধর্মী দর্শনের কথা। নির্বাচনের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি সহজ ও চটুল ভাষায় নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, নির্বাচনের আগে তিনি কোনো অলীক বেহেশতের টিকিট দেওয়ার ওয়াদা করেননি। বরং দুনিয়াতেই যেন মানুষ সম্মানের সাথে বাঁচতে পারে, আল্লাহর ইবাদত করতে পারে এবং সন্তানদের মাতৃত্বের পরম মমতায় লালন-পালন করতে পারে—সেই ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতিরই বাস্তব রূপ এই ফ্যামিলি কার্ড।

​এই কার্ডের জাদু কেমন হবে, তা মন্ত্রী একবারে ঘরের ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন উপস্থিত নারীদের। প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে বছরে মোট ৩০ হাজার টাকা জমা হবে এই কার্ডে। চিরকাল স্বামীর কাছে হাত পেতে চলা গ্রামীণ নারীদের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রী হেসে বলেন, "এবার আর জামাইর কাছে ঘুরতে হবে না, বরং জামাইরাই ঘুরে হাত পাতবে—টাকা দাও, টাকা দাও।" মন্ত্রীর এই রসাল অথচ বাস্তবধর্মী কথায় হলরুমে হাসির রোল বয়ে যায়, নারীদের চোখে ফুটে ওঠে স্বাবলম্বী হওয়ার এক আত্মবিশ্বাসী ঝিলিক। এদিন বিন্নাবাইদ ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের ৩৬৬ জন উপকারভোগী নারীর হাতে এই স্বপ্নের কার্ড তুলে দিয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়।

​দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের খবরও এদিন নরসিংদীর মাটি থেকে দেশবাসীকে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানে এমন এক নতুন ওষুধ এসেছে যা প্রসব বেদনাকে (লেবার পেইন) বিলম্বিত করে সিজারিয়ান অপারেশন ছাড়াই স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারি নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। আর এই আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেশের প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে সরকার একসঙ্গে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে। নাগরিকদের একটু ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি আশ্বস্ত করেন, দেশের প্রতিটি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।

​নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়ার সভাপতিত্বে আয়োজিত এই জমকালো অনুষ্ঠানে রাজনীতির এক বিরল সম্প্রীতির চিত্রও দেখা যায়। দলমত নির্বিশেষে এক মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনজুর এলাহী। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাফসা নাদিয়া। এছাড়াও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হন।

​বিকেলের আলো যখন ম্লান হয়ে আসছিল, তখন বেলাবোর হলরুম থেকে বেরিয়ে আসা নারীদের হাতে ধরা ছিল একটি করে ফ্যামিলি কার্ড। কার্ডগুলো কেবল কাগজের টুকরো ছিল না, তা ছিল যেন এক টুকরো স্বাধীনতা, আর ঘরের কোণে পড়ে থাকা প্রতিবন্ধী সন্তানটির জন্য একটি সুরক্ষিত ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় দলিল।

Advertisement
Advertisement
Advertisement