‘পাটওয়ারীর গালিতে আমরা অভ্যস্ত, মনঃক্ষুণ্ন হইনি’: সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়ানো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এর পরবর্তী নানা আলোচনা-সমালোচনা নিয়ে এবার প্রকাশ্যেই মুখ খুললেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর তোলা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের বিচারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন তিনি। সিইসি অত্যন্ত সাবলীল ও কিছুটা রসাত্মক ভঙ্গিতে জানিয়েছেন, এই ধরনের কড়া সমালোচনা কিংবা কটূক্তিতে তারা মোটেও বিপর্যস্ত নন, বরং তারা এসবের মুখোমুখি হতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। সোমবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (ইটিআই) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
রিপোর্টাস ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (আরএফইডি) আয়োজিত নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেক ও বিদায়ী কমিটির সদস্যদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সিইসি বেশ খোলামেলা আলোচনা করেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর স্বভাবসুলভ আচরণের একটি ভেতরের চিত্র তুলে ধরে সিইসি বলেন, এই নেতা প্রায়শই নির্বাচন কমিশনে এসে তাদের সাথে দেখা করতেন, অথচ দরজার বাইরে গিয়েই আবার গালিগালাজ করতেন। এই ধরনের দ্বিমুখী আচরণ সাংবাদিকদের কাছে নতুন কিংবা বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কিন্তু নির্বাচন কমিশনের কর্তাদের কাছে এটি এক প্রকার নিত্যদিনের ঘটনা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের এমন আচরণে তিনি বা তার কমিশন বিন্দুমাত্র ক্ষুব্ধ বা মনঃক্ষুণ্ন হননি, কারণ তারা শুরু থেকেই এক ধরনের অদৃশ্য প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে কাজ করে আসছেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর কড়া সমালোচনার ভেতরেও সিইসি তার ব্যক্তিগত প্রশংসা করতে ভুলেননি। তাকে জাতীয় পর্যায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে অভিহিত করে সিইসি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি পাটওয়ারীকে পছন্দ করেন কারণ তার মধ্যে মুখের ওপর স্পষ্ট কথা বলার একটি বিরল গুণ রয়েছে। তিনি অন্তরে যা বিশ্বাস করেন, সেটাই প্রকাশ করেছেন। সিইসির মতে, নিজের অনুভূতি ও ভিন্নমত প্রকাশের এই অবারিত সুযোগ থাকাই হলো প্রকৃত গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, আর সেই সৌন্দর্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তিনি এই বক্তব্যে সামান্যতম আহত হননি।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও মান নিয়ে যে নানামুখী বিতর্ক চলছে, সেটির দায় দেশবাসীর ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। নির্বাচন কেমন হয়েছে, তা নিয়ে গণমাধ্যম কিংবা জনগণের মনে নানা প্রশ্ন বা ক্ষোভ থাকতে পারে স্বীকার করে তিনি বলেন, এর চুলচেরা বিশ্লেষণের দায়িত্ব দেশবাসীর। এই নির্বাচন দেশীয় সাংবাদিকরা যেমন প্রত্যক্ষ করেছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক মহলও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। তাই কমিশন নিজে থেকে এই নির্বাচনের কোনো মূল্যায়ন বা সার্টিফিকেট দিতে চায় না। মানুষ যা দেখেছে, তারাই চূড়ান্ত রায় দেবে।
নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করে সিইসি বলেন, তারা কেউ ফেরেশতা নন এবং মানুষ হিসেবে তাদের কাজের মধ্যেও ভুল-ত্রুটি থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে তিনি এটি দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে, কমিশনের কোনো গোপন এজেন্ডা বা বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল না। একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়াই ছিল তাদের একমাত্র ব্রত, যেখানে প্রতিটি প্রার্থী সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ পেয়েছেন।
নির্বাচন আয়োজনে বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করে এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, প্রশাসনের পূর্ণ সহযোগিতা ছাড়া বিশাল এই যজ্ঞ সফল করা অসম্ভব। পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ স্বাধীনতায় কাজ করতে দিয়েছে এবং তাদের কোনো কাজে বিন্দুমাত্র রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করেনি। পরিশেষে সিইসি বলেন, তারা কতটুকু সফল বা ব্যর্থ হয়েছেন, সেই মূল্যায়ন যেমন দেশের মানুষ করবে, ঠিক তেমনি সমস্ত কাজের একটি চূড়ান্ত বিচার ও হিসাব মহান আল্লাহর দরবারে তোলা থাকবে।