ঢাকার আকাশেও সিঙ্গাপুরের ছোঁয়া: বিমানবন্দর আধুনিকায়নে আসছে 'ক্রিমসন ও এন্টারপ্রাইজ'
বিশেষ প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের বিমান যোগাযোগ ও পর্যটন খাতকে একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হতে যাচ্ছে। দেশের বিমানবন্দরগুলোর সেবার মান আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা জোরদার এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা আনতে এবার সরাসরি আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিঙ্গাপুরের বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান 'ক্রিমসন ও এন্টারপ্রাইজ'। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক হাব সিঙ্গাপুরের এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতকে আন্তর্জাতিক স্তরে সম্পূর্ণ নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার (১৭ মে) সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎকারে এই আগ্রহের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসে। বাংলাদেশে নিযুক্ত সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রদূত ডেরেক লো ইউ-সে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানমের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়।
বৈঠকে সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রদূত জানান যে, তার দেশের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ক্রিমসন ও এন্টারপ্রাইজ বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আধুনিক দুটি প্রযুক্তিগত সমাধান দিতে আগ্রহী। এর মধ্যে প্রথমটি হলো 'অ্যাডভান্সড প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন সিস্টেম' বা এপিআইএস, যা বিশ্বজুড়ে বিমানযাত্রীদের নিরাপত্তা এবং ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়াকে অভাবনীয় গতি এনে দিয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো যাত্রী বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই তার যাবতীয় তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার খাতিরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় প্রযুক্তিটি হলো 'বিমান চলাচল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা' বা এভিয়েশন রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, যা বিমানবন্দরের আয়-ব্যয় এবং শুল্ক আদায়ের পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজড ও স্বচ্ছ করে তুলবে।
সিঙ্গাপুরের এই সময়োপযোগী প্রস্তাবকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম। তিনি দেশের বিমান খাতের সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে সিঙ্গাপুরের মতো একটি উন্নত ও অভিজ্ঞ দেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। মন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একে একটি আঞ্চলিক বিমান চলাচল হাবে পরিণত করার জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, আর এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সিঙ্গাপুরের কারিগরি জ্ঞান বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
দ্বিপাক্ষিক এই আলোচনায় কেবল বিমান খাতের আধুনিকায়নই নয়, বরং বাংলাদেশের উদীয়মান পর্যটন শিল্পের বিকাশ নিয়েও বিস্তারিত কথা হয়। দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ) মডেলকে কাজে লাগানোর বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত পোষণ করেন। সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রদূত এই খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ ও সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে বড় ধরনের বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ সুগম করবে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সফল উদ্বোধনের পর থেকেই দেশের বিমান খাতকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুরের এই প্রস্তাবকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। আধুনিক সাংবাদিকতার ধারা অনুযায়ী, এই চুক্তি বা অংশীদারত্ব যদি চূড়ান্ত রূপ পায়, তবে তা কেবল যাত্রীসেবার মানই বাড়াবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতকে একটি শক্তিশালী ও নিরাপদ অবস্থানে দাঁড় করাবে। দুই দেশের এই যৌথ পথচলা আগামী দিনগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে।