ব্যক্তিগত অপকর্মের দায়ে পুরো বাহিনী কলঙ্কিত হতে পারে না: কুর্মিটোলায় র‍্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নাম পরিবর্তন ও নতুন এলিট ফোর্স আইনের ইঙ্গিত

 প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০৩:৩৯ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

ব্যক্তিগত অপকর্মের দায়ে পুরো বাহিনী কলঙ্কিত হতে পারে না: কুর্মিটোলায় র‍্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নাম পরিবর্তন ও নতুন এলিট ফোর্স আইনের ইঙ্গিত

 ​প্রতিবেদক ঢাকা:

 অতীতের রাজনৈতিক শাসনামলে কতিপয় কর্মকর্তার ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে এলিট ফোর্স হিসেবে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। তবে কোনো ব্যক্তির একক বা দলগত অপরাধের দায় পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো সমীচীন নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। সোমবার (১৮ মে) দুপুরে রাজধানীর কুর্মিটোলায় র‍্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন। বিগত সরকারের সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে যেভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল, তার ফলেই এই এলিট ফোর্সের গায়ে কলঙ্কের দাগ লেগেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এর গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পেয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

​স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মানবাধিকার সমুন্নত রেখে র‍্যাবের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। বিগত সময়ে এই বাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছিল, তা বহাল থাকার মূল কারণ ছিল ফ্যাসিবাদী সরকারের একদলীয় শাসন কায়েমের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বাহিনীকে ব্যবহার করা। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার র‍্যাবের আধুনিকায়ন ও খোলনলচে বদলে ফেলার ব্যাপারে ভাবছে। এরই অংশ হিসেবে বাহিনীর নাম পরিবর্তন করা হবে কি না, তা সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ‘অ্যাডহক’ ভিত্তিতে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের কিছু ধারার অধীনে পরিচালিত হওয়া এই বাহিনীর জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন, স্বতন্ত্র ও আধুনিক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই নতুন আইনের মাধ্যমে একটি প্রকৃত এলিট ফোর্স হিসেবে বাহিনীর ক্ষমতা, দায়িত্ব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনোভাবেই ক্ষমতার অপব্যবহার করার সুযোগ না থাকে।

​সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, আইন লঙ্ঘনকারী কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে এবং যারা ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করেছেন, তাদের নিজ নিজ আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, একটি সম্পূর্ণ নতুন আইনি কাঠামো এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে যখন একটি জবাবদিহিমূলক এলিট ফোর্স গড়ে তোলা সম্ভব হবে, তখন আন্তর্জাতিক মহল ও বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলো র‍্যাবের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করবে। বর্তমান সরকারের তিন মাসের মেয়াদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়নি এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলো এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে বলেও তিনি দাবি করেন।

​সংবাদ সম্মেলনে দেশের অন্যতম আলোচিত বিষয় 'গুম' ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, অতীতে ঘটে যাওয়া গুমের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইসিটি আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার প্রক্রিয়া চলছে। গুমের ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের বর্তমান পরিস্থিতি, কেউ ফিরে আসা বা না আসা এবং হুমকির শিকার হওয়ার মতো ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটকে আইনি সংজ্ঞায় এনে সুনির্দিষ্ট বিচারিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ইতোমধ্যে গঠিত গুম তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলো সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে এবং আইনগত যত দুর্বলতা রয়েছে তা দ্রুত সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

​র‍্যাব সদরদপ্তরে আয়োজিত এই তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের এক অভূতপূর্ব সমাবেশ ঘটে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, বিমান বাহিনীর ভারপ্রাপ্ত প্রধান এবং পুলিশের আইজিপিসহ র‍্যাবের মহাপরিচালক এবং আনসার ও বিডিবির ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা। উপস্থিত সুধীজন ও সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা মন্ত্রীর এই সংস্কারমুখী বক্তব্যকে সাধুবাদ জানান এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও মানবাধিকার-বান্ধব এলিট ফোর্স গঠনে সরকারের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ভূমিকা রাখবে বলে আশাপ্রকাশ করেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement