নিথর পাঁচটি দেহ, একটি গ্রাম ও বুকফাটা হাহাকার: ঘাতক স্বামী কি তবে অধরাই?

 প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ০৩:১২ অপরাহ্ন   |   ঢাকা

নিথর পাঁচটি দেহ, একটি গ্রাম ও বুকফাটা হাহাকার: ঘাতক স্বামী কি তবে অধরাই?

নিজস্ব প্রতিবেদক, গোপালগঞ্জ ও গাজীপুর

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইকান্দি গ্রাম। আজ সকালে যখন ভোরের আলো কেবল ফুটছে, তখন বাতাসের সাথে মিশে আসছিল এক করুণ কান্নার সুর। সকাল ছয়টায় যখন একটি মরদেহবাহী সাদা অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের মেঠো পথে এসে থামল, তখন উপস্থিত শত শত মানুষের চোখের জল বাঁধ মানেনি। একটি নয়, দুটি নয়—একই পরিবারের পাঁচটি নিথর দেহ কফিনে বন্দি হয়ে ফিরেছে নিজ ভিটেয়।

গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকান্দি গ্রামে ঘটে যাওয়া সেই লোমহর্ষক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার শারমিন, তাঁর ভাই এবং তিন অবুঝ শিশু এখন পাশাপাশি শুয়ে আছে পাইকান্দির পারিবারিক কবরস্থানে।

এক রাতের নারকীয় উৎসব

গত শুক্রবার রাতের কথা। ঘরে ছিল উৎসবের আমেজ; রান্না হয়েছিল মাংস আর পায়েস। কিন্তু কে জানত, সেই সুস্বাদু খাবারের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল মৃত্যুর নীল বিষ? ধারণা করা হচ্ছে, খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পরিবারের সবাইকে অচেতন করে ফেলে পাষণ্ড ফুরকান মিয়া। এরপর শুরু হয় মধ্যযুগীয় বর্বরতা। শারমিন বেগমকে (৩২) জানালার গ্রিলের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। রেহাই পায়নি তাঁর তিন আদরের সন্তান—মীম (১৪), হাবিবা (১০) এবং মাত্র দুই বছরের শিশু ফারিয়া। নিজ শোয়ার ঘরেই খাটের ওপর রক্তাত অবস্থায় পড়ে ছিল শারমিনের ভাই রসুল মিয়ার (২২) নিথর দেহ।

ঘাতকের সেই ভয়ঙ্কর ফোনকল

শনিবার ভোরে যখন মানুষ ঘুমে মগ্ন, ঠিক তখন খুনি ফুরকান মিয়া নিজেই স্বজনদের ফোন করে হিমশীতল কণ্ঠে জানায়—সে সবাইকে শেষ করে দিয়েছে। এরপর থেকেই সে নিরুদ্দেশ। পুলিশের ধারণা, পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ফুরকান এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।

লাশ দেখে বাকরুদ্ধ স্বজনরা

নিহত শারমিনের মামা আরজ শেখ কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, "গাজীপুরে গিয়ে যে দৃশ্য দেখেছি, তা কোনো মানুষের কাজ হতে পারে না। শারমিনকে ওরা গ্রিলের সাথে বেঁধে মেরেছে। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো কী দোষ করেছিল? আমরা ফুরকানের ফাঁসি চাই।" নিহতদের এক দুলাভাই জানান, ঘরজুড়ে ছোপ ছোপ রক্ত আর মেঝের ওপর পড়ে থাকা শিশুদের দেহগুলো দেখে কেউ চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি।

আইনি ব্যবস্থা ও পুলিশের তৎপরতা

এই নৃশংস ঘটনায় নিহত শারমিনের বাবা সাহাদত মোল্লা বাদী হয়ে কাপাসিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ফুরকান মিয়াকে প্রধান এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালীগঞ্জ সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, "এটি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও নৃশংস ঘটনা। প্রধান আসামি ফুরকানকে গ্রেপ্তারে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তাকে খুঁজে বের করার সব রকমের চেষ্টা চলছে।"

আজ সকালে পাইকান্দি গ্রামের জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের একটাই দাবি—ঘাতক ফুরকান যেন আইনের হাত থেকে রেহাই না পায়। দাফন শেষ হয়েছে, কিন্তু স্বজনদের হৃদয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তার বিচার কি পাবে এই অসহায় পরিবারটি? উত্তর এখন সময়ের হাতে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement