রাজনীতিতে গণতন্ত্রের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও চাই জনগণের অংশীদারিত্ব: অর্থমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
রোববারের এক ঝলমলে সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে যখন ‘রেইজ’ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হলো, তখন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কণ্ঠে ধ্বনিত হলো এক নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের সুর। তিনি কেবল সংখ্যার হিসাব বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে কথা বললেন না; বরং জোর দিলেন ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’-এর ওপর। অর্থমন্ত্রীর মতে, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন রাজপথের গণতন্ত্রের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পকেটেও গণতন্ত্রের সুফল পৌঁছাবে।
অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে অর্থমন্ত্রী এক দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মূলধারার অর্থনীতির বাইরে পড়ে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের কক্ষপথে ফিরিয়ে আনা এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এটি কোনো করুণা নয়, বরং নাগরিক হিসেবে তাঁদের অধিকার। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার পিকেএসএফ এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে গৃহীত প্রকল্পগুলোর ওপর আস্থা রাখছে, তবে প্রতিটি পয়সা ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড বজায় রাখার কঠোর বার্তাও দিয়েছেন তিনি।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে নারীদের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও বাস্তববাদী ঢঙে বলেন, বাংলার নারীরা পরিবারকে আগলে রাখতে জানেন, জানেন তিল তিল করে সঞ্চয় করার জাদুকরী কৌশল। আর সেই কারণেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে তাঁদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যা গ্রামীণ বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়িয়ে গ্রামীণ জনপদকে প্রাণবন্ত করে তুলবে। এর পাশাপাশি ‘কৃষক কার্ড’ যে দেশের কৃষিব্যবস্থায় এক নীরব বিপ্লব ঘটাবে, সেই আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।
তবে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে কেবল আশার বাণী নয়, ছিল কঠোর আত্মসমালোচনাও। আফগানিস্তানের চেয়েও বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বেশি হওয়াকে ‘লজ্জাজনক’ আখ্যা দিয়ে তিনি আগামীর বাজেটে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় বাড়ানো এবং সেবাগুলোকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসা যে তাঁর দপ্তরের মূল লক্ষ্য হবে, সেই প্রতিশ্রুতিও মিলল তাঁর কথায়।
বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে আছে, তারও এক সূক্ষ্ম ব্যবচ্ছেদ করেন তিনি। শীতলপাটির মতো ঐতিহ্যের উদাহরণ টেনে তিনি আক্ষেপ করেন যে, কেবল আধুনিক ডিজাইন ও কার্যকর মার্কেটিং কৌশলের অভাবে আমরা বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিতে পারছি না। একই আক্ষেপ ঝরে পড়ল দেশের সংস্কৃতি, নাটক, মিউজিক এবং ক্রীড়া ক্ষেত্র নিয়ে। তিনি মনে করেন, অ্যামাজনের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এশিয়ার অন্যান্য দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশকেও দ্রুত সেই ডিজিটাল বিপ্লবে শামিল হতে হবে।
সবশেষে অর্থমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন দেশের সেই সুপ্ত শক্তির কথা, যা আমাদের 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড'। এই যুবশক্তিকে দক্ষ করে তোলা এবং খেলাধুলা থেকে শুরু করে সৃজনশীল প্রতিটি খাতকে জিডিপিতে অবদান রাখার মতো সক্ষম করে তোলাই হবে আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য কেবল একটি প্রকল্পের উদ্বোধন নয়, বরং বৈষম্যহীন এক নতুন অর্থনৈতিক অভিযাত্রারই ইঙ্গিত দেয়।