ধুলোর চাদরে ঢাকা তিলোত্তমা: মে মাসের সকালে বিষাক্ত নিশ্বাসের গল্প
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ মে মাসের তপ্ত এক রোববার। প্রকৃতিতে এখন বৃষ্টির অঝোর ধারায় সিক্ত হওয়ার কথা থাকলেও, ঢাকার আকাশজুড়ে আজ কেবলই ধুলোর রাজত্ব। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের ব্যস্ত সকালে নগরবাসী যখন গন্তব্যে ছোটার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার (IQAir) এক দুঃসংবাদ বয়ে আনল—বিশ্বের ১২২টি শহরের মধ্যে দূষণে আজ ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়।
সকাল সাড়ে আটটার দিকে ঢাকার বায়ুমান সূচক দাঁড়িয়েছে ১৬৬-তে। আবহাওয়ার পরিভাষায় একে বলা হয় ‘অস্বাস্থ্যকর’। কিন্তু এই অস্বাস্থ্যকর বাতাসের দাপট পুরো শহরে সমান নয়। ঢাকার মানচিত্রের নয়টি এলাকায় নিশ্বাস নেওয়া আজ যেন রীতিমতো যুদ্ধ জয়ের সমান।
ধানমন্ডি থেকে বাড্ডা: যেখানে বাতাসই আজ শত্রু
সকালের রূপালি রোদে ধানমন্ডির লেকপাড়ে যারা একটু নির্মল বাতাসের আশায় বেরিয়েছিলেন, তাদের জন্য দিনটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ১৭৯ বায়ুমান সূচক নিয়ে আজ দূষণের শীর্ষে অবস্থান করছে ধানমন্ডি। লেকপাড়ের স্নিগ্ধতার বদলে সেখানে এখন কেবল ধুলোর আস্তর। দূষণের এই তালিকায় একে একে নাম উঠে এসেছে বারিধারা পার্ক রোড ও আগারগাঁওয়ের (উভয় স্থানে সূচক ১৭১)। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বেচারাম দেউড়ীতেও (১৬৯) আজ বাতাসের মান ভীষণ নাজুক।
অন্যদিকে মিরপুরের শেওড়াপাড়া (১৬৬), গুলশানের বে’জ এইজ ওয়াটার (১৬৫) এবং উত্তর বাড্ডার আবদুল্লাহবাগের (১৬৫) বাসিন্দারাও আজ ধুলোর কবলে পড়েছেন। এমনকি গুলশান লেক পার্ক (১৬৪) কিংবা গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (১৫৭) এলাকাতেও বাতাসের মান মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
কেন কাটছে না এই ধোঁয়াশা?
সাধারণত এপ্রিলের শেষ দিকে বৃষ্টির ছোঁয়ায় ঢাকার বাতাস ধুয়েমুছে পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু এবারের মে মাসেও বৃষ্টির দেখা নেই বললেই চলে। উন্নয়ন প্রকল্পের অনিয়ন্ত্রিত ধুলো আর যানবাহনের ধোঁয়া মিলে ঢাকাকে যেন এক বিশাল ধুলোর পাত্রে বন্দি করে ফেলেছে। বৃষ্টিহীন এই রুক্ষ আকাশ নাগরিক জীবনকে কেবল তপ্তই করছে না, বিষাক্ত করে তুলছে প্রতিটা নিশ্বাসকে।
সুরক্ষার যুদ্ধে নগরবাসী
এই দুঃসহ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শই এখন সাধারণ মানুষের বাঁচার অবলম্বন। আইকিউএয়ারের নির্দেশনা অনুযায়ী, আজ ঢাকার এই বিষাক্ত বায়ু থেকে বাঁচতে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে যারা কর্মস্থলে যাচ্ছেন, তাদের জন্য মাস্কই এখন প্রধান বর্ম।
যাঁরা ভোরের নির্মল বাতাসে শরীরচর্চা করতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য আজকের দিনটি কিছুটা ভিন্ন। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে বাইরে গিয়ে ব্যায়াম না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঘরের ভেতরটাকেও নিরাপদ রাখতে হবে—জানলাগুলো যতটা সম্ভব বন্ধ রাখতে হবে, যাতে বাইরের এই ‘বিষ’ ঘরের ভেতর প্রবেশ করে প্রিয়জনদের ক্ষতি করতে না পারে।
ঢাকার এই আকাশ কবে আবার নীল হবে, কবে নামবে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি—সেই প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে নগরবাসী। ততক্ষণ পর্যন্ত সতর্ক থাকাই যেন সুস্থ থাকার একমাত্র মন্ত্র।