আঞ্চলিক সম্প্রীতির নতুন দিগন্ত: ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক জোরদারে একমত দুই দেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি তে এক নতুন সমীকরণের আভাস দিয়ে দীর্ঘদিনের শীতলতা কাটিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। শনিবার (৯ মে) রাজধানী ঢাকায় সফররত পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নকভির সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের এক অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বৈঠকের শুরুতেই দুই নেতা একান্ত আলাপচারিতায় বসেন, যেখানে উঠে আসে দুই দেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক ঐক্যের গুরুত্ব। অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে শিক্ষা ও প্রযুক্তির মতো আধুনিক খাতগুলো প্রাধান্য পায়। প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম স্পষ্ট করেন যে, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’—এই আদর্শকে ধারণ করে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সম্মানজনক ও উৎপাদনশীল সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী।
আলোচনার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল স্থবির হয়ে পড়া আঞ্চলিক সংগঠন সার্ক-কে (SAARC) পুনরুজ্জীবিত করার প্রসঙ্গ। প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের স্বার্থে সার্কের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ সরকার এই প্ল্যাটফর্মটিকে আবার সক্রিয় করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অভাব-অভিযোগ দূর করে সম্মিলিত সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এই প্রস্তাবে গভীর সম্মতি জানান এবং একমত হন যে, দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও নিবিড় করা সময়ের দাবি।
বাণিজ্যিক প্রসারের ক্ষেত্রে দুই দেশই মনে করে, বর্তমানে বিদ্যমান বাণিজ্যের পরিমাণ তাদের প্রকৃত সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল এবং কৃষি পণ্যের আদান-প্রদান বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই দেশই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। আলোচনার টেবিলে কেবল রাষ্ট্রীয় নথিপত্রই ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ (People-to-people contact) বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। খেলাধুলা, বিশেষ করে ক্রিকেটের মাধ্যমে দুই দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে সুসম্পর্ক বিদ্যমান, তাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়ে তারা ঐকমত্যে পৌঁছান।
সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন নিয়েও বিশদ আলোচনা হয় বৈঠকে। বর্তমান যুগে ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে উভয় দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে একে অপরের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়াকে একটি ডিজিটাল হাবে পরিণত করার স্বপ্ন দেখছেন দুই নেতা। শিক্ষা ও বিজ্ঞান খাতে স্কলারশিপ এবং যৌথ গবেষণার সুযোগ তৈরির বিষয়েও প্রাথমিক রূপরেখা নিয়ে কথা হয়।
বৈঠক শেষে এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় জানানো হয়, এই সফর এবং আলোচনা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি দুই দেশের সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। উভয় পক্ষই অঙ্গীকার করেছেন যে, অতীতকে পেছনে ফেলে বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবেন। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই বৈঠকের সুদূরপ্রসারী প্রভাব কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপরই পড়বে না, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনয়নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।