কুয়েত মৈত্রী হলে পানির বিষাদ: শয্যাশায়ী শতাধিক ছাত্রী, আতঙ্কে ঢাবি ক্যাম্পাস

 প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১১:২৯ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

কুয়েত মৈত্রী হলে পানির বিষাদ: শয্যাশায়ী শতাধিক ছাত্রী, আতঙ্কে ঢাবি ক্যাম্পাস

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

​ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ প্রান্তের শান্ত সবুজ চত্বরে অবস্থিত বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল। চিরচেনা সেই প্রাণচঞ্চল হলে গত তিন দিন ধরে বিরাজ করছে এক গুমোট আতঙ্ক আর কান্নার সুর। হলের করিডোর দিয়ে এখন হাসাহাসির শব্দ নয়, বরং ভেসে আসছে অসুস্থ ছাত্রীদের যন্ত্রণাকাতর গোঙানি। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এক রহস্যময় অসুস্থতায় এখন পর্যন্ত হলের শতাধিক শিক্ষার্থী আক্রান্ত হয়েছেন। ডায়রিয়া আর ক্রমাগত বমিতে নিস্তেজ হয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের চাপে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্র।

​শনিবার (৯ মে) সকালে সরেজমিনে হলের ভেতরে গিয়ে দেখা যায় এক বিষণ্ণ চিত্র। কক্ষগুলোতে একের পর এক শিক্ষার্থী স্যালাইন হাতে শুয়ে আছেন। কেউ কেউ ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ দীর্ঘক্ষণ বমি করে ক্লান্তিতে চোখ মেলতে পারছেন না। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের আঙুল হলের সরবরাহকৃত পানির দিকে। তাদের দাবি, সম্প্রতি হলের পানির ট্যাংক পরিষ্কার করার পর থেকেই এই বিভীষিকার শুরু।

​হলের শিক্ষার্থী জুয়েনা আলম মুন অনেকটা অসহায় কণ্ঠে বলছিলেন তার অভিজ্ঞতার কথা। তিনি জানান, পানির ট্যাংক পরিষ্কারের পর থেকে কল ছাড়লেই নাকে আসছিল কড়া ব্লিচিং পাউডারের গন্ধ। সেই পানি দিয়ে মুখ ধুতে গেলেই বমিতে নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার উপক্রম হতো। জীবাণু ধ্বংস করার জন্য ব্লিচিং ব্যবহার করা হলেও, তা সঠিকভাবে নিষ্কাশন না করায় হিতে বিপরীত হয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।

​আরেক শিক্ষার্থী সাজরিন আমিনের কণ্ঠে ঝরল ক্ষোভ আর অভিমান। তিনি জানান, হলের ক্যান্টিনের রান্নার পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল তাদের। কিন্তু এবার যারা বাইরে থেকে পানি কিনে পান করেছেন বা ক্যান্টিনে খাননি, তারাও রেহাই পাননি এই মরণব্যাধি থেকে। ফলে পুরো হলের পানির লাইনে কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে বলেই সবার দৃঢ় বিশ্বাস। বর্তমানে হলের সাধারণ ছাত্রীদের মাঝে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে; সামর্থ্যবানরা বাজার থেকে বোতলজাত পানি কিনলেও অনেককেই পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।

​পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মোহাম্মদ ড. মোর্তজা মেডিকেল সেন্টার নড়েচড়ে বসেছে। প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. তানভীর আলী জানিয়েছেন, গত দুই দিনেই অন্তত ৬০ জন শিক্ষার্থী সরাসরি ক্লিনিকে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে হলের ভেতরে শয্যাশায়ী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। জরুরি অবস্থা বিবেচনায় হলের ভেতরেই একটি অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সার্বক্ষণিক সেখানে অবস্থান করে চিকিৎসাসেবা প্রদান করছেন। ডা. তানভীরের মতে, লক্ষণগুলো স্পষ্টভাবেই পানিবাহিত রোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

​এদিকে হলের এমন অচল অবস্থায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে কুয়েত মৈত্রী হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবা সুলতানা দাবি করেছেন, পরিস্থিতি এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। তিনি জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পেশাদার পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে পুনরায় হলের চৌবাচ্চা ও পানির ট্যাংকগুলো পরিষ্কার করানো হয়েছে। অসুস্থ শিক্ষার্থীদের যথাযথ দেখভাল করার জন্য হল প্রশাসন ও ছাত্র সংসদ একযোগে কাজ করছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

​সূর্যাস্তের ম্লান আলোয় হলের ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা এক অভিভাবক বলছিলেন, "মেয়ের স্বপ্ন পূরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু এখন তাকে স্যালাইন দিয়ে শুয়ে থাকতে দেখে বুকটা ফেটে যাচ্ছে।" ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের আবাসিক হলে এমন গণ-অসুস্থতার ঘটনা কেবল অব্যবস্থাপনারই প্রতিচ্ছবি কি না—সেই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে। আপাতত সবার প্রার্থনা, দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক কুয়েত মৈত্রী হলের এই মেধাবী মুখগুলো।

Advertisement
Advertisement
Advertisement