খাইবার পাখতুনখোয়ায় শোকের মাতম: বুলেটবিদ্ধ শান্তির দূত, বিচারহীনতায় ফুঁসছে পাকিস্তান

 প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১১:৩১ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

খাইবার পাখতুনখোয়ায় শোকের মাতম: বুলেটবিদ্ধ শান্তির দূত, বিচারহীনতায় ফুঁসছে পাকিস্তান

​আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের চারসাদ্দার সেই শান্ত সকালটি হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল তপ্ত সিসার শব্দে। গত মঙ্গলবার (৫ মে) ভোরের আলো যখন উসমানখেল এলাকার আকাশে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখনই উগ্রবাদের কালো থাবায় ঝরে যায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের প্রাণ। তিনি আর কেউ নন—বিখ্যাত আলেমে দ্বীন, শাইখুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ ইদরিস। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনের এই মহিরুহকে হারিয়ে আজ পুরো দেশ এক গভীর শোক ও বিষণ্ণতায় নিমজ্জিত। তবে এই শোকের সমান্তরালে আলেম সমাজ ও সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এখন জমাট বাঁধছে তীব্র ক্ষোভ, যার মূলে রয়েছে প্রশাসনের সীমাহীন ব্যর্থতা।

​হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও ঘাতকদের একজনকেও আইনের আওতায় আনতে পারেনি স্থানীয় পুলিশ। যদিও তদন্তকারী কর্মকর্তারা সেফ সিটি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে চারজন সন্ত্রাসীর ছবি সংগ্রহ করেছেন এবং একজনের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছেন, তবুও তাদের গ্রেফতার না করতে পারাটা বিচারব্যবস্থার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​সেই অভিশপ্ত মঙ্গলবার সকাল ৮টা ১০ মিনিটের দিকে মাওলানা ইদরিস যখন তার গাড়িতে করে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিলেন, তখনই দুটি মোটরসাইকেলে আসা চারজন অজ্ঞাত সন্ত্রাসী ঘিরে ধরে তার গাড়িটি। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় নির্বিচারে গুলিবর্ষণ। মাওলানার সঙ্গে থাকা দুই পুলিশ কনস্টেবল বীরত্বের সাথে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও ঘাতকদের বুলেট তাদের স্তব্ধ করে দেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথেই চিরবিদায় নেন এই বর্ষীয়ান আলেম। বর্তমানে আহত দুই পুলিশ সদস্য জেলা সদর হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।

​মাওলানা ইদরিসের এই বিদায়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা এই শোকবার্তা সাধারণ মানুষের মনে সান্ত্বনা দিতে পারছে না। গত বৃহস্পতিবার মাওলানা ইদরিসের বাসভবনে সমবেদনা জানাতে ছুটে যান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (জেইউআই-এফ) প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান। সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশে তিনি বলেন, "মাওলানা ইদরিস ছিলেন শান্তির এক অতন্দ্র প্রহরী। অথচ শান্তির পথ বেছে নেওয়া এই মানুষটিকেই শেষ পর্যন্ত অশান্তির বলি হতে হলো। একজন মুসলমানের সাথে মতভেদ থাকলেই তাকে হত্যা করা চরম অজ্ঞতা ও বর্বরতা।"

​ক্ষোভের অনল ছড়িয়ে পড়েছে বিদগ্ধ আলেম মুফতি তাকি উসমানীর হৃদয়েও। তিনি কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা একজন আলেমকে এভাবে প্রকাশ্যে রাজপথে হত্যা করতে পারে, তাদের মানুষ বা মুসলমান বলার কোনো অবকাশ নেই। বিচারের দাবিতে মাওলানা ফজলুর রহমানের ডাকে শুক্রবার জুমার নামাজের পর পুরো পাকিস্তান যেন এক বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। করাচি থেকে খাইবার—সবখানেই আলেমদের কণ্ঠে ছিল একই দাবি: "খুনিদের অবিলম্বে গ্রেফতার করো, নয়তো এই আন্দোলন থামবে না।"

​মাওলানা ইদরিস কেবল একজন শাইখুল হাদিসই ছিলেন না, তিনি ছিলেন হাজারো শিক্ষার্থীর দিশারি। তার শূন্যতা পাকিস্তানের ধর্মীয় শিক্ষা ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। এখন দেখার বিষয়, সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট থাকা ঘাতকদের ধরতে প্রশাসন কতটা আন্তরিক হয়, নাকি আরও একটি বিচারহীন হত্যাকাণ্ডের তালিকায় যোগ হবে মাওলানা ইদরিসের নাম। চারসাদ্দার বাতাস এখন কেবল শোকের ভারেই ভারাক্রান্ত নয়, বরং ইনসাফের অপেক্ষায় থাকা কোটি ভক্তের দীর্ঘশ্বাসেও ভারী হয়ে আছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement