প্রতিবেশীর নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন জামায়াত আমির: পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
টোকিও’র কর্মব্যস্ত সফর শেষে দেশের মাটিতে পা রাখতেই প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পরিস্থিতি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্পর্শকাতর বিষয়ে নিজের সুচিন্তিত ও কঠোর অবস্থান জানান দিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শনিবার দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো বিশেষ ধর্ম বা বর্ণকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নির্যাতন চালানো আধুনিক সভ্যতায় গ্রহণযোগ্য নয়। পশ্চিমবঙ্গের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেখানে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী যেন টার্গেট না হয়, সে বিষয়ে ভারত সরকারকে রাজধর্ম পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে ফেরার তৃপ্তি থাকলেও জামায়াত আমিরের কণ্ঠে ছিল প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নিয়ে এক ধরনের অভিভাবকসুলভ উদ্বেগ। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যখনই কোনো নিরপরাধ মানুষ জুলুমের শিকার হবে, জামায়াতে ইসলামী মজলুমের পাশে দাঁড়াতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ভারতের সংবিধান ধর্মনিপেক্ষতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। ফলে সেই দেশের মাটিতে প্রতিটি নাগরিকের সমান ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার পাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে যদি কোনো দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে তা হবে ভারতের নিজস্ব সংবিধান ও গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।
বিগত কয়েক দিন ধরে সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক অনুপ্রবেশের যেসব খবর চাউর হয়েছে, সে প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ অথচ কড়া বার্তা দেন। তিনি জানান, এই স্পর্শকাতর বিষয়টি দল গভীর পর্যবেক্ষণে রেখেছে এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। যদি দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয় বা অন্যায়ভাবে কাউকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে জামায়াতে ইসলামী রাজপথে নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না। তার ভাষায়, “আমরা প্রতিবেশীকে সম্মান করতে জানি, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে কেউ আমাদের জাতীয় মর্যাদাকে তুচ্ছজ্ঞান করবে।” বাংলাদেশের আত্মসম্মান রক্ষায় জনগণ জামায়াতের বলিষ্ঠ ভূমিকা দেখতে পাবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
সফরের প্রাপ্তি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি কিছুটা স্বস্তির হাসি হাসেন। জাপানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি জানান, এই সফর ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ। বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বিপ্লব ঘটাতে ক্যানসার চিকিৎসায় জাপানি প্রযুক্তি ও সহযোগিতা আনার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশাল যুবশক্তিকে দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তর করতে ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ প্রজেক্ট নিয়েও দেশটির নীতিনির্ধারকদের সাথে কথা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিমানবন্দরে আয়োজিত এই সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমান একদিকে যেমন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদারিত্বের বার্তা দিয়েছেন, অন্যদিকে সীমান্তের ওপারে থাকা বাংলাভাষী ও নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে তাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। জাতীয় রাজনীতির এই সংকটময় মুহূর্তে জামায়াত আমিরের এই অবস্থান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।