রুশ-ইউক্রেন রণক্ষেত্রে ঝরল কিশোরগঞ্জের রিয়াদের প্রাণ: শোকাতুর মাঝিরকোনা
স্টাফ করেসপনডেন্ট , কিশোরগঞ্জ
আকাশ থেকে ধেয়ে আসা একটি ড্রোন কেড়ে নিল সব স্বপ্ন। সুদূর রাশিয়ার হিমশীতল সীমান্তে ইউক্রেনীয় বাহিনীর অতর্কিত হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার তরুণ মো. রিয়াদ রশিদ (২৮)। গত ২ মে রুশ সীমান্তে সংঘটিত এই ভয়াবহ ড্রোন হামলায় রিয়াদসহ আরও দুই বাংলাদেশি ও একজন নাইজেরীয় নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
যুদ্ধের ময়দান থেকে আসা সেই দুঃসংবাদ
নিহত রিয়াদ করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ ইউনিয়নের মাঝিরকোনা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রশিদের চতুর্থ সন্তান। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে বিদেশে পাড়ি জমানো এই তরুণ যে যুদ্ধের ময়দানে নাম লিখিয়েছেন, তা ঘুণাক্ষরেও জানত না তার পরিবার।
গত শুক্রবার (৮ মে) সন্ধ্যায় রিয়াদের বাল্যবন্ধু ও একই ক্যাম্পে কর্মরত লিমন দত্তের একটি মেসেঞ্জার কল ওলটপালট করে দেয় পুরো পরিবারকে। লিমন জানান, ২ মে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় রিয়াদ ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। ওই হামলায় লিমন নিজেও একটি পা হারিয়ে বর্তমানে রাশিয়ার একটি সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এক বাবার আর্তনাদ ও অজানা অধ্যায়
নিহত রিয়াদের বাবা, জাফরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আব্দুর রশিদ কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন:"রিয়াদ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে, এটা ও আমাদের কখনও বলেনি। জানলে কি বাবা হয়ে ছেলেকে আগুনের মুখে পাঠাতাম? এখন শুনছি আমার ছেলে আর নেই। আমি শুধু আমার সন্তানের লাশটা একবার দেখতে চাই। একজন বাবার কাছে এর চেয়ে বড় বোঝা আর কী হতে পারে?"
কেন এই মৃত্যুমিছিল?
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উচ্চ বেতনে কর্মসংস্থানের প্রলোভনে পড়ে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বাংলাদেশি যুবক পর্যটক বা অন্য ভিসায় রাশিয়ায় গিয়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ফ্রন্টলাইনে বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন করা হচ্ছে। রিয়াদও একইভাবে নিয়মিত সৈন্য হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে এই যোগদানের প্রক্রিয়াটি বৈধ ছিল কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
এক নজরে ঘটনাপ্রবাহ:নিহত: মো. রিয়াদ রশিদ (২৮), মাঝিরকোনা, কিশোরগঞ্জ।ঘটনার তারিখ: ২ মে, ২০২৬ (প্রকাশিত তথ্যানুসারে)।আহত: লিমন দত্ত (সহকর্মী ও বন্ধু)।স্থান: রুশ-ইউক্রেন সীমান্ত এলাকা।পরিবার: পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে রিয়াদ ছিলেন চতুর্থ।
প্রশাসনের বক্তব্য ও লাশের অপেক্ষা
রিয়াদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মাঝিরকোনা গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠেছে চারপাশ। রিয়াদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী ও শোকসন্তপ্ত পরিবার। তবে যুদ্ধকবলিত এলাকা হওয়ায় মরদেহ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধ যেখানে কেবল মানচিত্র পরিবর্তনের খেলা, সেখানে রিয়াদের মতো সাধারণ তরুণদের জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়া বিশ্বজুড়ে এক চরম মানবিক বিপর্যয়েরই প্রতিফলন।