ব্যালটের বিপ্লব শেষে এবার ইশতেহার জয়ের লড়াই: ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গড়ার শপথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
ভোরের কুয়াশাভেজা আলো তখনও রাজধানীর রাজপথ থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি, কিন্তু ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন চত্বরে উপচে পড়া ভিড় জানান দিচ্ছিল এক নতুন শুরুর। ব্যালটের যুদ্ধে বিজয়ের তিলক পরে ক্ষমতার মসনদে আসীন হওয়ার পর, আজ এক ভিন্ন যুদ্ধের ডাক দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে এ যুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়, এ যুদ্ধ নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার—এ যুদ্ধ মানুষের আস্থার মান রাখার।
শনিবার সকালে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে হৃদয়ে ধারণ করে বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, “আমাদের একটি যুদ্ধ শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত লড়াই শুরু হলো আজ থেকে। মানুষকে আমরা যে রঙিন আগামীর স্বপ্ন দেখিয়েছি, তার প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়ন করাই এখন আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।”
ফার্মগেটের মিলনায়তনে যখন পিনপতন নীরবতা, তখন প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় এক আবেগঘন প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন গত ১২ ফেব্রুয়ারির সেই উত্তাল নির্বাচনের কথা। উপস্থিত নেতাকর্মীদের চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা সাক্ষী, সেই নির্বাচন কতটা বন্ধুর ছিল। আমি বলেছিলাম পথটা কঠিন, আর আপনারা প্রতি পদক্ষেপে তা অনুভব করেছেন। কিন্তু দেশের মানুষ আমাদের ফেরায়নি। ৫২ শতাংশ মানুষের সেই রায় আজ আমাদের কাঁধে এক বিশাল দায়িত্বের জোয়াল তুলে দিয়েছে।”
তারেক রহমানের ভাষায়, নির্বাচনের আগে যে ইশতেহারটি ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ‘ম্যানিফেস্টো’, আজ তা বাংলাদেশের সতেরো কোটি মানুষের প্রাণের দলিলে পরিণত হয়েছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “জনগণ আমাদের ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন এই ইশতেহার আর শুধু বিএনপির নয়, এটি এখন সরকারের এবং জনগণের। আমাদের মেধা ও শ্রমের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে এই অঙ্গীকারনামা বাস্তবায়ন করতে হবে।”
প্রধানমন্ত্রী যখন সুশাসনের কথা বলছিলেন, তখন তার কণ্ঠে ছিল আগামীর এক আধুনিক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। তিনি এমন এক জনপদের স্বপ্ন দেখালেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা ফিরে পাবে শিক্ষার প্রকৃত পরিবেশ, যেখানে মাঝরাতে একজন নারী কিংবা শিশু নির্ভয়ে রাজপথে চলাচল করতে পারবে। দীর্ঘ লড়াইয়ের স্মৃতি চারণ করে তিনি বলেন, “আমরা স্বৈরাচার আর ফ্যাসিবাদের অবসান চেয়েছিলাম যাতে রাজনীতির মাঠে প্রতিহিংসা নয়, বরং যুক্তি আর বিতর্কের সুস্থ ধারা ফিরে আসে। আমরা চেয়েছিলাম এমন এক দেশ যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হবে মৌলিক অধিকার।”
দলের নেতাকর্মীদের প্রতি একটি বিশেষ বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “এটি বিএনপি সরকার। আর এই সরকারের সাফল্যের চাবিকাঠি নিহিত আছে আপনাদের সহযোগিতার ওপর। দল যদি সরকারকে সঠিক পথে সহায়তা না করে, তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।”
সভাপতির আসনে বসা রুহুল কবির রিজভী এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে এই সভাটি এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়। স্থায়ী কমিটির বর্ষীয়ান নেতাদের উপস্থিতিতে দিনব্যাপী চলা এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি ছিল ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর মাঠ পর্যায়ের নেতাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সরাসরি মতবিনিময়।
বিকেলের দিকে যখন সভার সমাপ্তি ঘটল, তখন নেতাকর্মীদের চোখেমুখে ছিল এক নতুন প্রত্যয়। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা যেন এক শান্তিময় ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হিসেবে রাজপথে নামার নতুন রসদ খুঁজে পেয়েছেন। রাজনীতির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা এক নেতার হাত ধরে দেশ এখন কোন দিগন্তে পৌঁছায়, সেই অপেক্ষাতেই এখন পুরো বাংলাদেশ।