​গাজীপুরে মধ্যরাতে জনরোষের তান্ডব: গরু চোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা, ট্রাকে অগ্নিসংযোগ

 প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১২:৪৩ অপরাহ্ন   |   ঢাকা

​গাজীপুরে মধ্যরাতে জনরোষের তান্ডব: গরু চোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা, ট্রাকে অগ্নিসংযোগ

​নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর | ১০ মে, ২০২৬

​রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তখন কেবল ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষায় গাজীপুরের কালিয়াকৈর। ঠিক সেই মুহূর্তে ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের বাঘচালা গ্রামে নেমে এলো এক পৈশাচিক উন্মাদনা। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর গরু চুরির আতঙ্কে অতিষ্ঠ এলাকাবাসীর রুদ্রমূর্তির বলি হলেন তিনজন। গরু চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তারা। কেবল প্রাণহানিই নয়, উত্তেজিত জনতা চোরদের ব্যবহৃত ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দিয়ে নিজেদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

​ঘটনার সূত্রপাত রোববার দিবাগত শেষ রাতে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরেই কালিয়াকৈর ও এর আশপাশের এলাকায় গবাদি পশু চুরির উপদ্রব চরম আকার ধারণ করেছিল। প্রান্তিক কৃষকদের সম্বল কেড়ে নিচ্ছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। রোববার ভোররাতে একটি ট্রাক নিয়ে বাগমারা এলাকায় হানা দেয় একদল চোর। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে, গ্রামবাসী আগে থেকেই সতর্ক অবস্থানে ছিল।

​সন্দেহভাজন ট্রাকটি গ্রামে প্রবেশ করতেই চারদিক থেকে মসজিদের মাইকে ঘোষণা বা সংকেত ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে লাঠিসোঁটা আর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কয়েকশ গ্রামবাসী চোরদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। অবস্থা বেগতিক দেখে ট্রাক ফেলে বেশ কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও জনতার হাতে আটকা পড়েন তিনজন। দীর্ঘদিনের হালের বলদ আর দুধের গাভী হারানোর বেদনা তখন সাধারণ মানুষকে এক হিংস্র উন্মত্ততায় পরিণত করে। শুরু হয় নির্বিচার গণপিটুনি। উন্মত্ত জনতার হাত থেকে বাঁচতে তারা আকুতি জানালেও বৃষ্টির মতো পড়তে থাকা লাঠির আঘাত আর কিল-ঘুষিতে এক সময় নিস্তেজ হয়ে পড়েন তিনজনই।

​খবর পেয়ে কালিয়াকৈর থানার পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, ততক্ষণে সব শেষ। মাঠের এক কোণে পড়ে ছিল তিনটি নিথর দেহ। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়েও উত্তেজিত জনতা শান্ত হয়নি; তারা চোরদের ব্যবহৃত ট্রাকটিতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা সেই ট্রাকের লেলিহান শিখা যেন গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতার ক্ষোভেরই প্রতিফলন ঘটাচ্ছিল।

​কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, গরু চুরির অভিযোগে এলাকাবাসীর পিটুনিতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তিনি আরও জানান, উত্তেজিত জনতা একটি ট্রাকে আগুন দিলে সেটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

​আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ঘটনা আবারও গ্রামীণ জনপদে নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। একদিকে যেমন চুরির আতঙ্কে দিশেহারা কৃষক, অন্যদিকে সামান্য সন্দেহে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার এই ভয়াবহ প্রবণতা সমাজবিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলছে। বাঘচালা গ্রামের এই রক্তক্ষয়ী ভোরের রেশ কাটতে হয়তো অনেক সময় লাগবে, কিন্তু যে তিনটি প্রাণ ঝরে গেল আর যে ট্রাকটি পুড়ে ছাই হলো, তা রেখে গেল অনেকগুলো অমীমাংসিত প্রশ্ন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement