কাপাসিয়ায় নিথর ৫ দেহ: ঘাতক কি তবে আপনজনই?
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর।।
বিছানায় পড়ে ছিল তিন শিশু, জানালার গ্রিলে বাঁধা স্ত্রীর নিথর দেহ; মরদেহের পাশে রহস্যময় চিরকুট ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউতকোনা গ্রামটি যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই সেখানে ঘটে গেছে এক পৈশাচিক নারকীয়তা। যে ঘরটি ছিল শিশুদের কলকাকলিতে মুখর, আজ সেখানে কেবল জমাট বাঁধা রক্ত আর স্তব্ধতা। প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে একই পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে এখন শোক আর আতঙ্কের ছায়া।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভাষ্য এবং পারিপার্শ্বিক আলামত বিচারে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মূল কারিগর আর কেউ নন—স্বয়ং গৃহকর্তা ফোরকান মিয়া।
রক্তের হোলি ও এক পাষণ্ড পিতার কলঙ্ক
শুক্রবার দিবাগত রাতের কোনো এক প্রহরে ঘাতক তার নিষ্ঠুরতার স্বাক্ষর রাখে। শনিবার সকালে পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন তারা দেখে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য। ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল ২ থেকে ১৫ বছর বয়সী তিন নিস্পাপ শিশুর নিথর দেহ। মেজো মেয়ে মারিয়া (৮) আর ছোট্ট ফারিয়া (২) হয়তো ঘুমের ঘোরে বুঝতেই পারেনি তাদের আপন জন্মদাতাই যমদূত হয়ে শিয়রে দাঁড়িয়েছে। বড় মেয়ে মীম (১৫), যার চোখে ছিল আগামীর স্বপ্ন, তাকেও রেহাই দেয়নি ঘাতক।
সবচেয়ে বীভৎস দৃশ্য ছিল ফোরকানের স্ত্রী শারমিনের (৩০)। তাকে জানালার গ্রিলের সঙ্গে বেঁধে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। পাশের খাটে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল ফোরকানের শ্যালক রসুল মিয়ার (২২) মরদেহ।
হত্যার পর শ্বশুরবাড়িতে ফোন!
এ ঘটনার পর ফোরকানের একটি আচরণ সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর ফোরকান মিয়া পালিয়ে যাওয়ার আগে গোপালগঞ্জে তার শ্বশুরবাড়িতে ফোন করেন। ঠান্ডা মাথায় তিনি জানান, পরিবারের সবাইকে ‘শেষ করে দেওয়া হয়েছে’। এরপর থেকেই তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
মরদেহের পাশে রহস্যময় নথি
তদন্তে নেমে পুলিশ এক অদ্ভুত ও চাঞ্চল্যকর ক্লু খুঁজে পেয়েছে। যেখানে যেখানে মরদেহ পড়ে ছিল, তার প্রতিটি স্থানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল কিছু প্রিন্ট করা কাগজ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালীগঞ্জ সার্কেল) আসাদুজ্জামান জানান, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এগুলো কোনো মামলার নথিপত্র বা অভিযোগের কপি। কেন ঘাতক এগুলো মরদেহের পাশে রেখে গেল, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। হয়তো এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে হত্যাকাণ্ডের মূল মোটিভ।
খাবারের সঙ্গে কি মেশানো ছিল বিষ?
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ঘরের ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে রান্না করা সেমাই, কোকাকোলা এবং একটি মদের বোতল উদ্ধার করেছেন। পুলিশের ধারণা, পরিবারের সদস্যদের আগে থেকেই খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক কিছু খাইয়ে অচেতন করা হয়েছিল, যাতে তারা চিৎকার বা প্রতিরোধের সুযোগ না পায়। ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য খাবারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
পলাতক ফোরকান ও পুলিশের অভিযান
একটি সাজানো সংসারকে মুহূর্তেই শ্মশানে পরিণত করে দিয়ে ফোরকান এখন পলাতক। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক চৌকস দল মাঠে নেমেছে। কী এমন ক্ষোভ বা নেপথ্য কারণ ছিল যা একজন মানুষকে নিজের সন্তানদের খুনি বানাতে পারে, সেই জট খুলতে কাজ করছে পিবিআই ও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট।
রাউতকোনা গ্রামের বাতাসে এখন কেবল স্বজনদের কান্নার রোল। পাড়া-প্রতিবেশীরা নির্বাক। সবার মনে একটাই প্রশ্ন—মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে নিজের কলিজার টুকরো সন্তানদের এভাবে বিদায় দিতে পারে?