জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে প্রবাসীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান আসিফ মাহমুদে
অনলাইন ডেস্ক:
বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পর নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন ও 'জুলাই সনদ' বাস্তবায়নে প্রবাসীদের জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। দক্ষিণ কোরিয়া সফর উপলক্ষে স্থানীয় সময় রোববার (১৭ মে) দুপুর ১২টায় খিম্পু শহরের খিম্পু ফরেন সাপোর্ট সেন্টারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক জমকালো নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এই আহ্বান জানান। এনসিপি ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্স দক্ষিণ কোরিয়া শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কোরিয়ায় অবস্থানরত দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ছাড়াও নানা শ্রেণিপেশার প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশ নেন। দূর পরবাসে দেশের মাটিতে ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থানের নায়কদের কাছ থেকে দেখতে এবং তাদের কথা শুনতে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবাসীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ডায়াস্পোরা সদস্যদের এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্তরিকতা ও উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি চারণ করে তিনি বলেন, দেশ যখন চারদিক থেকে অবরুদ্ধ ছিল এবং ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে জনগণের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তখন প্রবাসীরাই বিশ্ব দরবারে মুক্তির আলো ও আশা জাগিয়ে রেখেছিলেন। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স শাটডাউনসহ নানা কূটনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারকে চরম চাপে ফেলেছিল। গণঅভ্যুত্থানের সেই ক্রান্তিলগ্নে প্রবাসীদের এই অসামান্য ও সাহসী ভূমিকার কথা জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, কেবল সরকার পতনই শেষ কথা নয়, আসল লড়াই শুরু হয়েছে এখন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা, জুলাই সনদ এবং জনগণের প্রত্যক্ষ রায়ের প্রতিফলন হিসেবে গণভোটের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে প্রবাসীদের অতীতের মতোই ঐক্যবদ্ধ ও সক্রিয় থাকতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া এই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান এবং এর পেছনের আত্মত্যাগের গল্প আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্ববাসীর কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে প্রবাসীদের এক একজন দূত হিসেবে কাজ করার তাগিদ দেন তিনি। প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আসিফ মাহমুদ আশ্বাস দেন যে, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোতেও যেন প্রবাসীদের ভোটাধিকার শতভাগ নিশ্চিত থাকে, তা নিয়ে এনসিপি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত বলেন, কোরিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মাঠের যোদ্ধাদের মতোই সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নতুন বাংলাদেশের আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণ ও পলিসি তৈরিতে প্রবাসীদের মেধা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় এনসিপি। কোরিয়ার ঐতিহাসিক গোয়াংজু ডেমোক্রেসি ফোরামে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোরিয়ার নাগরিকরা যেভাবে বছরের পর বছর লড়াই করে তাদের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। বাংলাদেশের বিগত স্বৈরাচারবিরোধী লড়াই ও গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে বিশ্বের বুকে সঠিকভাবে ব্র্যান্ডিং করার এখনই উপযুক্ত সময়।
আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পর শুরু হয় প্রবাসীদের মুক্ত আলোচনা ও মতবিনিময় পর্ব। এ সময় দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও শিক্ষার্থীরা তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও নানাবিধ সংকটের কথা তুলে ধরেন। প্রবাসীরা দাবি করেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় কোনো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বা রেমিট্যান্স যোদ্ধা মারা গেলে তার মরদেহ সরকারি খরচে ও বিনামূল্যে দেশে পাঠানোর স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া কোরিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও অভিবাসন প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ করার দাবি জানান তারা। কোরিয়া আসার ক্ষেত্রে এখনো যে সব দালাল চক্র ও এজেন্সির অপতৎপরতা রয়েছে, তা কঠোর হস্তে দমন এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের লাগেজ হয়রানি ও কাস্টমসের দুর্ব্যবহার বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য এনসিপি নেতাদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রবাসীদের অধিক অন্তর্ভুক্তির দাবিও ওঠে এই আলোচনা থেকে। এনসিপি নেতৃবৃন্দ প্রবাসীদের এসব যৌক্তিক দাবি মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং তা সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন।
এনসিপি ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্স দক্ষিণ কোরিয়ার আহ্বায়ক আরিফুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব বাবুল মিয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য আয়মান রাহাতসহ কোরিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি প্রবাসীদের অধিকার আদায় ও নতুন বাংলাদেশ গড়ার এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়।