অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিভছে চেরাগ: এক চোখের দৃষ্টি হারালেন ইমরান খান, উত্তাল পাকিস্তান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পাকিস্তানের রাজনীতির ‘পোস্টার বয়’ থেকে শুরু করে কারান্তরালের একাকী বন্দী—ইমরান খানের জীবন এখন যেন এক ট্র্যাজেডির মহাকাব্য। দীর্ঘ ১,০০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে কারারুদ্ধ পাকিস্তানের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে এবার এক ভয়াবহ আশঙ্কার খবর দিলেন তাঁর দলের শীর্ষ নেতারা। পিটিআই মহাসচিব সালমান আকরাম রাজা দাবি করেছেন, কারাগারে অমানবিক নির্যাতন ও চিকিৎসার অভাবে ইমরান খান তাঁর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন। ইসলামাবাদে সুপ্রিম কোর্টের আঙিনায় দাঁড়িয়ে যখন রাজা এই তথ্য দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ আর বিচারহীনতার হাহাকার।
ইমরান খানের এই শারীরিক বিপর্যয়ের শুরুটা হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। আদালতের নথিপত্র বলছে, তাঁর চোখে ‘সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেইন অক্লুশন’ (সিআরভিও) নামক একটি জটিল রোগ শনাক্ত হয়েছে। এটি এমন এক অবস্থা যেখানে রেটিনার প্রধান রক্তবাহী শিরাটি বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ এবং মানসিক চাপের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। গত ২৮ এপ্রিল তাঁকে চতুর্থবারের মতো চোখের ইনজেকশন দেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। পিটিআই-এর দাবি, সঠিক সময়ে উন্নত চিকিৎসা না দিয়ে তাঁকে ধীরে ধীরে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
কারাগারের এই নির্জন প্রকোষ্ঠে কেবল ইমরান খান নন, তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিও আইনি লড়াই আর রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে বন্দি হয়ে আছেন। সালমান আকরাম রাজা অভিযোগ করেন, পিটিআই প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যদের এমনকি আইনজীবীদেরও দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ওকালতনামায় স্বাক্ষর নিতে বাধা দিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। ব্রিটিশ আমলের চেয়েও কঠিন বিধিনিষেধ এখন পাকিস্তানে জারি রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, আজ পাকিস্তানের বিচার বিভাগ যেন এক অদৃশ্য শক্তির কবলে পড়ে নুয়ে পড়েছে; যে বিচারকরা ন্যায়বিচার করতে চাইছেন, তাঁদের শাস্তিস্বরূপ বদলি করে দেওয়া হচ্ছে।
২০১৮ সালে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা ইমরান খানের পতন ছিল অনেকটা নাটকীয়। ২০২২ সালে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই তাঁর ওপর নেমে আসে মামলার খড়গ। তোশাখানা মামলা থেকে শুরু করে সাইফার কেস—শত শত মামলায় বিদ্ধ হয়ে ২০২৩ সাল থেকে তিনি কারাগারে। কিন্তু এবার তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারানোর খবরটি পুরো পাকিস্তানে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
খাইবার পাখতুনখোয়ার রক্তাক্ত সীমান্ত থেকে শুরু করে করাচির রাজপথ—সবখানেই এখন হাহাকার। সালমান আকরাম রাজা আক্ষেপ করে বলেন, দেশের অর্থনীতি আজ ধ্বংসের কিনারে, আর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে অন্ধ কুঠুরিতে তিলে তিলে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের সব দরজায় কড়া নেড়েও যখন সাড়া মেলেনি, তখন পিটিআই নেতৃত্ব এখন জনগণের আদালতের দিকেই তাকিয়ে আছেন। ইমরান খানের এই নিভে যাওয়া চোখের দৃষ্টি কি পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন কোনো আগ্নেয়গিরির জন্ম দেবে? সময় এখন সেই উত্তরই খুঁজছে।