শঙ্কা আর উৎকণ্ঠার নাম এখন তেহরান: রাতভর ৯ বার কাঁপল ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
শান্ত ও নিঝুম রাত হঠাৎ করেই যেন বিভীষিকায় রূপ নিল ইরানের রাজধানী তেহরানের উপকণ্ঠে। মঙ্গলবার দিবাগত রাত থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত ঘুমের ঘোরে থাকা মানুষগুলো বারবার কেঁপে ওঠা মাটির স্পর্শে আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। তেহরানের পূর্ব দিকে অবস্থিত পারদিস এলাকায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৯ বার অনুভূত হয়েছে ভূমিকম্পের ঝটকা। ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সি এবং কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বরাতে জানা গেছে, এই ধারাবাহিক কম্পনগুলো মৃদু হলেও তা এক বিশাল বিপর্যয়ের অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন ভূ-তত্ত্ববিদরা।
রাতভর এই আতঙ্ক শুরুর মূল কেন্দ্র ছিল মোশা ফল্ট লাইন। প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ফাটলটি তেহরান থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এটি ইরানের অন্যতম বিপজ্জনক সক্রিয় ফল্ট। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৯টি কম্পনের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৪.৬। যদিও সৌভাগ্যবশত এই ঘটনায় কোনো বড় ধরনের প্রাণহানি বা দালানকোঠা ধসে পড়ার খবর পাওয়া যায়নি, কিন্তু মানুষের মনে গেঁথে গেছে বড় এক ভয়ের বীজ।
সাধারণত ইরানে ছোটখাটো ভূমিকম্প হওয়া নতুন কিছু নয়, তবে একই স্থানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৯ বার কম্পন হওয়াকে অত্যন্ত বিরল এবং রহস্যময় বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তেহরান মূলত বেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর এবং চারপাশে গড়ে ওঠা একটি শহর। বছরের পর বছর ধরে এই ফল্টগুলোতে সঞ্চিত টেকটোনিক চাপ যে কোনো মুহূর্তে একটি প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিতে পারে বলে দীর্ঘকাল ধরে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, তেহরানের জনঘনত্ব এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন এমন কোনো বড় দুর্যোগের সামনে শহরটিকে অসহায় করে তুলতে পারে।
ইরানের সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে আজও দগদগে ক্ষত হয়ে আছে ২০০৩ সালের বাম ভূমিকম্পের বিভীষিকা। সেই প্রলয়নাচনে নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল আস্ত একটি শহর, প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ। পারদিস এলাকার এই ৯ বারের মৃদু কাঁপুনি যেন সেই পুরনো স্মৃতিকেই নতুন করে উসকে দিচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এখন একটাই প্রশ্ন—এই ছোট ছোট কম্পনগুলো কি কোনো বড় মহাপ্রলয়ের পূর্বাভাস?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোশা ফল্টের এই হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠা মোটেও হেলাফেলার বিষয় নয়। মাটির নিচে জমা হওয়া বিশাল শক্তি নির্গত হওয়ার এটি একটি প্রক্রিয়া হতে পারে, আবার এটি হতে পারে আরও বড় কোনো ধ্বংসলীলার ভূমিকা। আপাতত বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও তেহরান জুড়ে এখন বিরাজ করছে এক থমথমে অস্বস্তি। সরকার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিলেও প্রকৃতির এই রহস্যময় আচরণের সামনে এক গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে ইরানবাসীর।