জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশকে ব্রাজিলের ঐতিহাসিক সমর্থন: ব্রিকসে অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস

 প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০১:১৯ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশকে ব্রাজিলের ঐতিহাসিক সমর্থন: ব্রিকসে অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস

​আন্তর্জাতিক ডেস্ক : 

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিশাল মাইলফলক অর্জন করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ঐতিহাসিক ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদের নির্বাচনে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার শীর্ষ পরাশক্তি ব্রাজিল। শুধু তা-ই নয়, উদীয়মান অর্থনীতির শক্তিশালী জোট ‘ব্রিকস’-এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে লাতিন আমেরিকার এই দেশটি। বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে দুই দেশের এই নতুন কৌশলগত মেরুকরণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ সাড়া ফেলেছে।

​স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ 'পালাসিও দো প্লানালতো'-তে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা করেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার প্রধান উপদেষ্টা সেলসো আমোরিম। আসন্ন ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে সভাপতি পদের জন্য বাংলাদেশ সাইপ্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ল্যাটিন আমেরিকার অন্যতম প্রধান দেশ ব্রাজিলের এই প্রকাশ্য সমর্থন বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অবশ্য ব্রাজিলের পাশাপাশি এই পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে ইতিমধ্যে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে আফ্রিকার প্রভাবশালী দেশ আলজেরিয়াও।

​বৈঠকে ব্রাজিলের উপদেষ্টা সেলসো আমোরিম ভূ-রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি দুদেশের মধ্যে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সংলাপ ও কৌশলগত সমন্বয় আরও গভীর করতে একটি নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম বা ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশের প্রতি ব্রাজিলের এই দ্বিধাহীন সমর্থনকে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঢাকার গঠনমূলক ভূমিকা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপাক্ষিকতার প্রতি দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারের স্বীকৃতি হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, বিশ্বমঞ্চে গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রতি ব্রাজিলের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। ব্রাজিলের এই আন্তরিক প্রস্তাব ও সমর্থনকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বিশ্ব যখন যুদ্ধ, চরম বৈষম্য, জলবায়ু সংকট ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতার মতো অত্যন্ত জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন জাতিসংঘকে আরও বেশি কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সময়ের দাবি। আর বাংলাদেশ ও ব্রাজিল যৌথভাবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করতে পারে।

​কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার বিষয়টিও এই বৈঠকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় চার বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে দুই দেশের অর্থনীতির বিশাল সম্ভাবনা ও বাজারের আকারের তুলনায় এই বাণিজ্যিক সম্পর্ককে এখনও ‘অপর্যাপ্ত’ বলে মনে করেন উভয় প্রতিনিধি। এ প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির ব্যাখ্যা করেন যে, বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে ব্রাজিল থেকে বিপুল পরিমাণ তুলা, সয়াবিন, চিনি ও কৃষিপণ্য আমদানি করে থাকে। বিপরীতে, ব্রাজিলের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, বিশ্বমানের ওষুধ, পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্য ও সিরামিক রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে বিদ্যমান মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমাতে হবে এবং দুই দেশের মধ্যে সরাসরি শিপিং বা নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করাসহ যৌথ বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।

​আলোচনায় উঠে আসে দুই দেশের আসন্ন ফরেন অফিস কনসালটেশনস (এফওসি) বা পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের বৈঠকের প্রসঙ্গও। ব্রাজিলের আগামী সাধারণ নির্বাচনের পরপরই এই এফওসি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে এবং কৃষি, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ক্রীড়া, জ্বালানি ও উদ্ভাবনসহ বহুমুখী ক্ষেত্রে একাধিক চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়ে উভয় পক্ষ গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

​বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি পুনর্ব্যক্ত করে উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান যে, ঢাকার বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি ‘সমতা, মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পৃক্ততা’র নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমান সরকার কোনো ধরনের নতজানু বা আত্মসমর্পণমূলক পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাস করে না, বরং দেশের কূটনীতি হবে সম্পূর্ণ আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন এবং শতভাগ জাতীয় স্বার্থভিত্তিক। একই সাথে দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও জোরদার অর্থনৈতিক সহযোগিতার স্বার্থে বাংলাদেশ সরকার আঞ্চলিক জোট সার্ক-কে (SAARC) পুনরুজ্জীবিত করতে অত্যন্ত আগ্রহী বলে লাতিন আমেরিকার এই দেশটিকে অবহিত করেন তিনি।

​বৈঠকের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক জোট ব্রিকস-এ (BRICS) বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়ার প্রসঙ্গটি। হুমায়ুন কবির এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রবল আগ্রহের কথা তুলে ধরলে ব্রাজিলের প্রধান উপদেষ্টা সেলসো আমোরিম অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দেন। তিনি জানান যে, বিষয়টি নিয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করবেন এবং এই জোটের সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্রাজিলের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে। ঠিক একই সময়ে বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ব্রিকসের আওতাধীন নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) একটি আঞ্চলিক শাখা ঢাকায় স্থাপনের জন্য ব্রাজিলের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি যুক্তি দেখান যে, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এনডিবির শেয়ারহোল্ডার বা সদস্য রাষ্ট্র হলেও দেশে ব্যাংকটির কোনো আঞ্চলিক কার্যালয় না থাকায় বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কিছুটা সীমিত হয়ে পড়ছে। ঢাকায় একটি শাখা স্থাপিত হলে তা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাংকের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে। সামগ্রিকভাবে, এই বৈঠকটি বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে, যা অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement