‘বিদায় বলবেন না বরং বলি, আবার দেখা হবে’: বিদায়ী ভারতীয় হাইকমিশনার
বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা।
বাংলাদেশে কাটানো মধুর দিনগুলোর স্মৃতি বুকে নিয়ে বিদায়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবেগঘন বার্তা দিলেন বিদায়ী ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। গণমাধ্যমকর্মীদের সম্মানে আয়োজিত এক বিদায়ী অনুষ্ঠানে তিনি চিরচেনা ‘বিদায়’ শব্দটির পরিবর্তে ‘আবার দেখা হবে’ বলে নতুন এক বন্ধুত্বের বার্তা রেখে যান। শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর কূটনৈতিক পাড়ার ‘ইন্ডিয়া হাউস’-এ সুর, স্মৃতিচারণ আর আড্ডার মধ্য দিয়ে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন এই বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে রাজধানীর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক, কূটনৈতিক প্রতিবেদক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হয়ে প্রণয় ভার্মা ও তার স্ত্রী মনু ভার্মাকে শুভকামনা জানান।
কূটনৈতিক জীবনের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষে ঢাকা ছাড়ছেন প্রণয় ভার্মা। সম্প্রতি বেলজিয়াম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ভারতের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। বিদায়ী বক্তৃতায় বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তার ভূয়সী প্রশংসা করে প্রণয় ভার্মা বলেন, বাংলাদেশ সবসময়ই তার হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান জুড়ে থাকবে। এখানে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যে উষ্ণ স্নেহ, আন্তরিকতা এবং গভীর বন্ধুত্ব পেয়েছেন, তা তার পুরো ক্যারিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতার গাম্ভীর্য ভেঙে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আপনাদের সমর্থন ও পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ। বিদায় বলবেন না বরং বলি ‘আবার দেখা হবে’। আমি সত্যিই আশা করি, কোথাও না কোথাও আবার আমাদের দেখা হবে।” কেবল কথার পিঠে কথা নয়, নিজের এই আবেগকে সুরে বেঁধে প্রকাশ করতে তিনি বাংলা ও হিন্দিতে দুটি গান গেয়ে শোনান, যা অনুষ্ঠানস্থলে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।
২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন প্রণয় ভার্মা। এর আগে ভিয়েতনামে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল এই পেশাদার কূটনীতিকের। ঢাকায় তার প্রায় চার বছরের কার্যকালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে, বিশ্ব রাজনীতির নানা সমীকরণ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে তার কূটনৈতিক প্রজ্ঞা দুই দেশের সম্পর্ককে একটি পরিপক্ব রূপ দিতে সাহায্য করেছে। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহেই তার ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে।
শনিবারের এই সুধী সমাবেশে উপস্থিত হয়ে প্রণয় ভার্মার কূটনৈতিক দক্ষতার প্রশংসা করেন এবং তার ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্য কামনা করেন দেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সাবেক ঢাকা ব্যুরো প্রধান ফরিদ হোসেন, চ্যানেল আইয়ের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান, চ্যানেল ২৪-এর নির্বাহী পরিচালক জহির আলম এবং বর্তমান এপি ব্যুরো প্রধান জুলহাস আলম। এ ছাড়া ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব)-এর সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক এমরুল কায়েশসহ সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও কূটনৈতিক প্রতিবেদকেরা এই বিদায় আড্ডায় অংশ নেন।
এদিকে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভারত সরকার ইতিমধ্যেই দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি শিগগিরই ঢাকায় এসে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনের এক পরিচিত ব্যক্তিত্ব। ভারতের তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) শীর্ষস্থানীয় সদস্য হিসেবে তিনি কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের আমলে ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব সামলেছেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালে দল পরিবর্তন করে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন। একজন ঝানু রাজনীতিক ও অভিজ্ঞ প্রশাসক হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর এই নিযুক্তিকে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বেগবান করার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। প্রণয় ভার্মার রেখে যাওয়া বন্ধুত্বের পথ ধরে নতুন হাইকমিশনারের হাত ধরে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক আগামীতে কোন মাত্রায় পৌঁছায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।