পনেরো বছরের প্রথা ভাঙল বাংলা: প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ে কড়া নিষেধাজ্ঞা মহাকরণের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গঙ্গার ঘাটে আজ অন্যরকম ভোরের আলো ফুটেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পশ্চিমবঙ্গের আকাশে-বাতাসে এখন নতুন ব্যবস্থার সুর। ঠিক যেমনটা আভাস দিয়েছিল নবনির্বাচিত সরকার, ঠিক তেমনভাবেই ক্ষমতা দখলের অল্প দিনের মাথায় এক ঐতিহাসিক ও কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল রাজ্যের বর্তমান বিজেপি প্রশাসন। বৃহস্পতিবার নবান্ন থেকে জারি করা এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এখন থেকে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে প্রকাশ্যে গরুসহ সব ধরনের পশু জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান পরবর্তী এক নতুন আইনি অধ্যায় শুরু হলো বাংলায়। এনডিটিভির এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে এবার থেকে এমন সব শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা আগে কখনও কল্পনাও করেনি সাধারণ মানুষ। প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে, ‘পশু’ মানে এখানে কেবল গরু বা মহিষ নয়, বরং নির্দিষ্ট সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই এই নিয়ম সমভাবে প্রযোজ্য হবে।
ফিটনেস সনদ ও কঠোর শর্তের বেড়াজাল
এখন থেকে চাইলেই কসাইখানায় পশু নিয়ে যাওয়া যাবে না। প্রতিটি পশুর জন্য প্রয়োজন হবে একটি ‘ফিটনেস সনদ’ বা শারীরিক সক্ষমতার প্রমাণপত্র। সংশ্লিষ্ট এলাকার পৌরসভা বা পঞ্চায়েতের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং একজন সরকারি পশু চিকিৎসকের যৌথ স্বাক্ষরে এই সনদ মিলবে। তবে এই সনদ পাওয়াটাও এক অগ্নিপরীক্ষার মতো। নিয়মে বলা হয়েছে, যে পশুর বয়স ১৪ বছরের কম, তাকে কোনোভাবেই জবাইয়ের অনুমতি দেওয়া হবে না। পশুকে কেবল তখনই ‘জবাইযোগ্য’ ঘোষণা করা যাবে, যখন সে প্রজনন ক্ষমতা হারাবে, কোনো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে কিংবা বার্ধক্যের কারণে স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারাবে।
সরকারের এই নতুন আদেশে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কঠোরতার এক অদ্ভুত মিশেল লক্ষ করা গেছে। যদি কোনো কারণে কর্তৃপক্ষ সনদ দিতে অস্বীকার করে, তবে আবেদনকারী হার মানার সুযোগ পাবেন না। তিনি ১৫ দিনের মধ্যে সরাসরি রাজ্য সরকারের উচ্চতর মহলে আপিল করার আইনি অধিকার পাবেন।
কসাইখানা বনাম জনসমাগমস্থল
এই আইনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ হলো পশুর ‘শেষ যাত্রার’ স্থান নির্ধারণ। এবার থেকে পাড়ার মোড়ে, বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গায় বা কোনো জনসমাগমস্থলে পশু জবাইয়ের দৃশ্য দেখা যাবে না। বিজ্ঞপ্তিতে কঠোরভাবে জানানো হয়েছে, জবাইয়ের অনুমতি পাওয়া পশু কেবল পৌরসভার অনুমোদিত কসাইখানা বা প্রশাসনের নির্ধারিত স্থানেই নিয়ে যেতে হবে। আইন অমান্যকারীর জন্য শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে যথেষ্ট কড়া—ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা এক হাজার রুপি জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে অভিযুক্তকে।
তদারকিতে ‘ফ্লাইং স্কোয়াড’
আইনটি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না বর্তমান সরকার। নিয়ম বাস্তবায়নে পৌর চেয়ারম্যান, পঞ্চায়েত সভাপতি এবং পশু চিকিৎসকদের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তারা যখন-তখন যে কোনো স্থাপনা বা কসাইখানা পরিদর্শন করতে পারবেন। এই পরিদর্শন কাজে বাধা দেওয়া হবে দণ্ডনীয় অপরাধ।
কলকাতার রাজপথ থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের চা বাগান—সর্বত্রই এই নতুন নিয়ম নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসানের পর বিজেপি সরকার তাদের আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে কোনো সময় নষ্ট করতে চাইছে না। প্রশাসনের অন্দরমহলে এখন একটাই গুঞ্জন—এই কঠোর আইন কি বাংলার চিরাচরিত সামাজিক সমীকরণে কোনো বড় পরিবর্তন আনবে?
সে উত্তর সময়ই দেবে, তবে আপাতত বৃহস্পতিবারের এই বিজ্ঞপ্তি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।