ঈদের আগে ক্যালিফোর্নিয়ার মসজিদে ভয়াবহ বন্দুক হামলা: হামলাকারীসহ নিহত ৫, নেপথ্যে ঘৃণা ছড়ানোর শঙ্কা

 প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ১২:৪৪ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ঈদের আগে ক্যালিফোর্নিয়ার মসজিদে ভয়াবহ বন্দুক হামলা: হামলাকারীসহ নিহত ৫, নেপথ্যে ঘৃণা ছড়ানোর শঙ্কা

​আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। উৎসবের আমেজে যখন মেতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়, ঠিক তখনই এক ভয়াবহ ও নৃশংস বন্দুক হামলার ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো সান ডিয়েগো শহর। মেক্সিকো সীমান্ত ঘেঁষা এই শহরের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহ্যবাহী একটি ইসলামিক সেন্টারের মসজিদে দুই কিশোরের অতর্কিত গুলিবর্ষণে এক নিরাপত্তাকর্মীসহ তিন ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন। পরবর্তীতে মসজিদ থেকে কিছুটা দূরে একটি পরিত্যক্ত গাড়ি থেকে হামলাকারী দুই কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রাথমিক ধারণা, নৃশংস এই হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর তারা নিজেরাই নিজেদের বুকে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এই ঘটনায় গোটা যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র ক্ষোভ, শোক এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

​স্থানীয় সময় সোমবার ঠিক দুপুর ১২টার দিকে সান ডিয়েগোর ওই ইসলামিক সেন্টারে আকস্মিক এই হামলার ঘটনা ঘটে। বহুতল এই কেন্দ্রটি মূলত একটি বড় ইসলামি স্কুল হিসেবে পরিচালিত হয়, যেখানে প্রতিদিন শত শত শিশু দ্বীনি ও সাধারণ শিক্ষা গ্রহণ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রতিদিনের মতো সোমবারও স্কুলটিতে ক্লাস ও অন্যান্য নিয়মিত কার্যক্রম চলছিল। আচমকা মুহুর্মুহু গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো চত্বর। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে নিরাপত্তার খোঁজে ছুটতে থাকেন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা। তবে সৌভাগ্যবশত, হামলাকারীরা স্কুলের মূল শ্রেণিকক্ষগুলোতে প্রবেশ করতে না পারায় কোনো শিশু হতাহত হয়নি। স্কুল কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ এবং নিরাপত্তাকর্মীদের সাহসিকতার কারণে বহু নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ রক্ষা পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, উন্মত্ত ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে মসজিদের সুরক্ষায় নিয়োজিত একজন নিরাপত্তাকর্মী এবং মসজিদের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে সংশ্লিষ্ট অপর দুই ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই মারা যান।

​রক্তাক্ত এই হামলার পরপরই ঘটনাস্থলে ছুটে আসে সান ডিয়েগো পুলিশ বিভাগের বিশাল একটি দল। পরবর্তীতে তল্লাশি অভিযান চালিয়ে মসজিদ থেকে সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সন্দেহভাজন গাড়ি থেকে দুই হামলাকারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত ওই দুই কিশোরের একজনের বয়স ১৭ এবং অন্যজনের ১৯ বছর বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। সান ডিয়েগোর শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা স্কট ওয়াল এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে জানান, প্রাথমিক নানামুখী পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট যে, হামলা সম্পন্ন করার পরপরই ঘাতক কিশোরেরা নিজেদের বন্দুকের গুলিতে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। ঠিক কী কারণে এই দুই তরুণ এমন আত্মঘাতী ও সহিংস পথ বেছে নিল, তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ঘটনাস্থলের আলামত এবং তাদের আক্রমণের ধরন দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মুসলিমদের প্রতি চরম ঘৃণাপূর্ণ মনোভাব বা ‘ইসলামোফোবিয়া’ থেকেই এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে।

​ধর্মীয় উপাসনালয়ে এই ধরনের কাপুরুষোচিত হামলার নেপথ্য কারণ উদঘাটনে ইতিমধ্যেই মার্কিন প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। স্থানীয় পুলিশের পাশাপাশি ঘটনার গভীরতা ও আন্তর্জাতিক সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-এর (FBI) উচ্চপর্যায়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। গোয়েন্দারা ইতিমধ্যেই নিহত দুই কিশোরের পারিবারিক পটভূমি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম এবং তারা কোনো উগ্রপন্থী বা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, উপাসনালয়ে যেকোনো ধরনের সহিংসতা মার্কিন মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং এর পেছনে থাকা মূল উগ্রবাদী চক্রকে খুঁজে বের করা হবে।

​এই চরম সংকটের মুহূর্তে শোকস্তব্ধ সান ডিয়েগোর মুসলিম সমাজ। মসজিদের প্রধান ইমাম তাহা হাসান গভীর আবেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সকে বলেন যে, এই অঞ্চলের শান্তিপ্রিয় মুসলিম জনগোষ্ঠী এর আগে কখনও এমন ভয়াবহ ও নির্মম ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়নি। মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা হলো উপাসনালয়, আর সেই পবিত্র স্থানকে এভাবে রক্তাক্ত লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত ভয়ানক এবং অমানবিক একটি ব্যাপার। আসন্ন ঈদুল আজহার আনন্দ এই একটি ঘটনায় ম্লান হয়ে গেছে এবং স্থানীয় প্রবাসী ও বাসিন্দাদের মনে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার পর থেকে সান ডিয়েগোসহ ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement