সংবিধান সংশোধন নাকি সংস্কার: মতদ্বৈধতায় ঝুলে আছে বিশেষ কমিটি, আলোচনায় সমাধানের প্রত্যাশা
অনলাইন ডেস্ক:
ত্রয়োদশ সংসদের শুরুতেই সংবিধান পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে সরকারি ও বিরোধীদলীয় জোট। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের সরকারি উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারা কেবল জোড়াতালির 'সংশোধন' নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ 'সংস্কার' চায়। রাজনৈতিক এই নীতিগত পার্থক্যের কারণে আটকে গেছে ১৭ সদস্যের প্রস্তাবিত বিশেষ কমিটি গঠনের কাজ, যা নিয়ে জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে।
সদ্য সমাপ্ত গণঅভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের শাসনতন্ত্র বা সংবিধানকে নতুনভাবে সাজানোর দাবি উঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। সেই ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সরকারি জোটের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, এই ১৭ সদস্যের কমিটিতে সরকারদলীয় জোট থেকে ১২ জন এবং বিরোধীদলীয় জোট থেকে ৫ জন প্রতিনিধি থাকবেন। সরকারি দলের প্রত্যাশা ছিল, সংসদের দুই পক্ষের সমন্বয়ে একটি সর্বসম্মত রূপরেখা তৈরি করা। তবে সরকারি দলের এই প্রস্তাবে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি বিরোধী জোট। তারা কমিটির জন্য তাদের নির্ধারিত ৫ জন প্রতিনিধির কোনো নাম জমা না দেওয়ায় থমকে যায় পুরো প্রক্রিয়া। সংসদ অধিবেশনে এই কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের আইনপ্রণেতারা নিজ নিজ অবস্থানের পক্ষে পাল্টাপাল্টি যুক্তি ও আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন, যা সংসদীয় বিতর্কে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
বিরোধী জোটের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। দলটির দাবি, বর্তমান সংবিধানের খোলনলচে না বদলে কেবল কিছু ধারা সংশোধন করলে তা জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে না। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম এই বিষয়ে আইনগত ও রাজনৈতিক পার্থক্য তুলে ধরে বলেন, সরকার গঠন করতে চাইছে ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’, অথচ বর্তমান সময়ের দাবি হলো একটি ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি’। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই দুই ধারণার মধ্যে বিরাট মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিরোধী দল যদি এই সংশোধন কমিটিতে যোগ দেয়, তবে সংবিধানের আমূল সংস্কারের যে বৃহত্তর তাগিদ ও জনদাবি রয়েছে, তা চিরতরে অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।
এই অবস্থানে বিরোধী জোটের আরেক শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বিগত সরকারের আমলের উদাহরণ টেনে বর্তমান সংবিধানের সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা ও অনুচ্ছেদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেই দেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কায়েম করা হয়েছিল। শেখ হাসিনা সাংবিধানিকভাবেই দেশে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিগত দিনে যতগুলো সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে এবং যত অন্যায় হয়েছে, তার সবকিছুর পেছনেই এই ত্রুটিপূর্ণ সংবিধানকে আইনি বৈধতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে এই সংবিধানের খণ্ডিত সংশোধন কোনো টেকসই সমাধান আনবে না, বরং এর সামগ্রিক সংস্কার প্রয়োজন।
এই অচলাবস্থা ও মতভিন্নতার মধ্যেও অবশ্য আশার আলো দেখছে সরকারি দল। আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতাগুলো কাটিয়ে আলোচনার মাধ্যমেই একটি সুরাহা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা। সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, এই মতদ্বৈধতাকে তিনি বড় কোনো সংকট হিসেবে দেখছেন না এবং খুব শিগগিরই আলোচনার টেবিলেই এর সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসবে। একটি কমিটি যেহেতু গঠন করা হয়েছে, তাই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধী দলকে অন্তর্ভুক্ত করেই সংবিধান পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
চিফ হুইপ আরও জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকারকে দেশের নানা মৌলিক বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে ঐক্যের ভিত্তিতেই কাজ করতে হবে এবং সেই ঐক্যের ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় রয়েছে সরকারের। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কারের এই বিতর্ক কেবল শব্দের লড়াই নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের ভবিষ্যৎ শাসন ব্যবস্থার রূপরেখা। শেষ পর্যন্ত সরকার ও বিরোধী দল আলোচনার মাধ্যমে কোনো মধ্যপন্থা খুঁজে পায় কিনা, নাকি এই অচলাবস্থা সংসদীয় প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত করে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।